ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা হামলায় বদলাচ্ছে যুদ্ধের সমীকরণ

Spread the news

৬ মার্চ : মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েলের চলমান সংঘাত নতুন ও জটিল রূপ নিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েল অব্যাহতভাবে তেহরানসহ ইরানজুড়ে বিমান থেকে বোমা নিক্ষেপ ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে, যা শহরাঞ্চলে ব্যাপক ধ্বংসের কারণ হয়েছে। ইরানও প্রতিবেশী দেশগুলোতে মার্কিন সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে। বৃহস্পতিবার ইরাক ও কুয়েতে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ড্রোন আঘাত হেনেছে, এছাড়া পারস্য উপসাগরে একটি মার্কিন তেলবাহী জাহাজও লক্ষ্যবস্তু হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরায়েলের হামলায় শীর্ষ রাজনৈতিক ও সামরিক নেতাদের মৃত্যু সত্ত্বেও ইরানের পাল্টা আক্রমণ যুদ্ধের হিসাব-নিকাশকে বদলে দিচ্ছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দেশটি মধ্যপ্রাচ্যে আরও সেনা ও সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমের পরিধি বৃদ্ধি করছে। মার্কিন সামরিক বিশ্লেষকদের অনুমান, এই সংঘাত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।

ইরানে হামলা চালানো এবং পাল্টা হামলা প্রতিহত করায় নেতৃত্ব দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। ফ্লোরিডার সদর দপ্তরে অতিরিক্ত সামরিক গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের নিয়োগের জন্য পেন্টাগনকে অনুরোধ করা হয়েছে। পেন্টাগনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই কর্মকর্তারা অন্তত ১০০ দিন বা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ইরান সংঘাত পর্যবেক্ষণে দায়িত্ব পালন করবেন।

যুক্তরাজ্যের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মন্ত্রী হেমিশ ফলকনারও ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে এবং এ সংকট কয়েক সপ্তাহ বা কয়েক মাস স্থায়ী হতে পারে।

ইরানের ওপর দফায় দফায় বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার কারণে নিহতের সংখ্যা ১,২৩০-এ দাঁড়িয়েছে, যার মধ্যে ১৮০ শিশু রয়েছেন। তেহরানে বহু বহুতল ভবন ধ্বংস হয়ে গেছে। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত অন্তত ১৭৪টি শহরে হামলা চালানো হয়েছে এবং ৩,৬৪৩টির বেশি বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, অন্তত ১৩টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রও হামলার শিকার হয়েছে।

ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, গতকাল ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ১৯তম ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। এর মধ্যে উত্তর ইরাকের এরবিল ও কুয়েতের আরিফজানে মার্কিন ঘাঁটিতে আঘাত হানা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাতেও ৬টি ক্ষেপণাস্ত্র ও ১৩১টি ড্রোন আঘাত হানায় অন্তত ছয়জন আহত হয়েছেন।

লেবাননে ইজরায়েল স্থল অভিযান চালাচ্ছে এবং হিজবুল্লাহকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালাচ্ছে। ত্রিপোলি এলাকায় ফিলিস্তিনি শরণার্থী শিবিরে ইজরায়েলের বিমান হামলায় হামাস নেতা ওয়াসিম আতাল্লাহ আল আলি ও তাঁর স্ত্রী নিহত হয়েছেন। সোমবার থেকে লেবাননে ইসরায়েলের হামলায় ১০২ জন নিহত ও ৬৩৮ জন আহত হয়েছেন। হিজবুল্লাহ পাল্টা হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে। পরিস্থিতির জেরে বৈরুতসহ আক্রান্ত এলাকায় বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাচ্ছেন।

যুদ্ধ এখন আরও বিস্তৃত হচ্ছে। ইরানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্তবর্তী আজারবাইজানের একটি বিমানবন্দরসহ দু’টি জায়গায় ড্রোন হামলা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত এখন ১৩টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ন্যাটোর মিত্রদেশ ইতালি ও অস্ট্রেলিয়া সামরিক সরঞ্জাম পাঠাচ্ছে, আর যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স তাদের ঘাঁটিগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাজে ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছে। কাতারে আরও চারটি যুদ্ধবিমান মোতায়েন করা হয়েছে।

রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কঠোর সমালোচনা করেছে। মস্কো বলেছে, তারা আরব দেশগুলোকে ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে টেনে আনার চেষ্টা করছে। রাশিয়ার মতে, পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার একমাত্র উপায় হলো ইরানের ওপর হামলা বন্ধ করা।

যুদ্ধের শুরুতে ট্রাম্প আশা করেছিলেন, সামরিক অভিযানে ইরানের শীর্ষ নেতা এবং কর্মকর্তাদের হত্যার মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল পাওয়া যাবে। কিন্তু ইরানের পাল্টা হামলা ও পরিস্থিতির জটিলতায় যুদ্ধ দীর্ঘমেয়াদি হওয়ার পথে। ট্রাম্প ও রিপাবলিকানদের রাজনৈতিক ঝুঁকি বেড়েছে, বিশেষ করে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। তাঁর উপদেষ্টারা জানিয়েছেন, এই সংঘাত কয়েক সপ্তাহ চলতে পারে, তবে বড় ধরনের অঘটন এড়ানো প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র : রয়টার্স, আল-জাজিরা, খবর : দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ডিজিটাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *