মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ২২ ফেব্রয়ারি : মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে ২১শে ফেব্রুয়ারির পবিত্র সন্ধ্যায় পাথারকান্দি কবি সাহিত্যিক সংস্থা “আমার ভাষা আমার প্রাণ” এক অনাড়ম্বর কিন্তু হৃদয়স্পর্শী অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করে। ভাষা শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করে সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরীর বাসভবনে আয়োজিত এই সাংস্কৃতিক সন্ধ্যায় আলোচনা, সঙ্গীত ও স্বরচিত কবিতা পাঠের মধ্য দিয়ে ভাষার মাহাত্ম্য তুলে ধরা হয়।অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এক আবেগঘন পরিবেশনার মধ্য দিয়ে। শিক্ষিকা ও সঙ্গীত শিল্পী মধুমিতা মণ্ডল অমর সঙ্গীত আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো পরিবেশন করে উপস্থিত সকলকে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিচারণায় আপ্লুত করে তোলেন। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয় আত্মত্যাগ, সংগ্রাম ও মাতৃভাষার প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসার অঙ্গীকার।দিনটির তাৎপর্য ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে সুচিন্তিত বক্তব্য রাখেন শিক্ষক এএস হোসেন আহমদ, শিক্ষক সঞ্জীব বৈদ্য এবং সমাজকর্মী সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী। বক্তারা বলেন, মাতৃভাষা শুধু ভাব প্রকাশের মাধ্যম নয়, এটি আমাদের আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভিত্তি। বিশ্বায়নের যুগে মাতৃভাষার চর্চা ও সংরক্ষণ আরও জরুরি হয়ে উঠেছে। তাঁরা নতুন প্রজন্মকে ভাষা চর্চায় উদ্বুদ্ধ করার আহ্বান জানান। সঙ্গীতের ডালি নিয়ে আসরকে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখেন বেতার শিল্পী সুদীপ্ত পুরকায়স্থ। তাঁর সুরেলা পরিবেশনা সন্ধ্যাকে এক অন্য মাত্রা দেয়। তাঁকে তবলায় দক্ষতাপূর্ণ সহযোগিতা করেন কঙ্কন ভট্টাচার্য, পারকাসনে ছিলেন স্মিতা দাস ও সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী। তাঁদের সমন্বিত পরিবেশনায় সৃষ্টি হয় এক অপূর্ব সুরের মূর্ছনা, যা উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের গভীরভাবে আলোড়িত করে। বিভিন্ন স্বাদের সঙ্গীত পরিবেশন করে অনুষ্ঠানকে আরও সমৃদ্ধ করেন ফণীগোপাল নাথ, শিক্ষক ও কবি সঞ্জীব বৈদ্য এবং মধুমিতা মণ্ডল।
দেশাত্মবোধক, লোকগীতি ও আধুনিক গানের সমন্বয়ে সন্ধ্যাটি হয়ে ওঠে বৈচিত্র্যময় ও প্রাণবন্ত। স্বরচিত কবিতা পাঠের পর্ব ছিল অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ। কবিতার মাধ্যমে ভাষার প্রতি ভালোবাসা, সমাজচেতনা ও মানবিক মূল্যবোধ তুলে ধরেন সিদ্ধার্থ শেখর পাল চৌধুরী, ফণী গোপাল নাথ, সঞ্জীব বৈদ্য, মধুমিতা মণ্ডল ও মনোজ কুমার রায়। তাঁদের কবিতায় ফুটে ওঠে একুশের চেতনা, আত্মত্যাগের গৌরব ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়বদ্ধতার বার্তা।অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন জোড়বাড়ি হাজি কাছিম আলি হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক মনোজ রায়, স্বাস্থ্য কেন্দ্রের ব্লক প্রোগ্রাম ম্যানেজার সৌমেন্দ্র দাস, অসীম ধর, নাট্যকর্মী রাজেশ দে, শিপ্রা পাল চৌধুরী, শিক্ষক তোফাইল আহমেদ বরভূঁইয়া এবং সৌমব্রত পাল চৌধুরীসহ এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের উপস্থিতি অনুষ্ঠানকে আরও মর্যাদাপূর্ণ করে তোলে। সুন্দর ও সুচারুভাবে সমগ্র অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শিক্ষক এ. এস. হোসেন আহমেদ। তাঁর সাবলীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানটি এক সুশৃঙ্খল ও আবেগঘন পরিসমাপ্তি লাভ করে।
পরিশেষে, পাথারকান্দি কবি সাহিত্যিক সংস্থা “আমার ভাষা আমার প্রাণ”-এর এই আয়োজন প্রমাণ করে যে মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি আমাদের হৃদয়ের গভীরে প্রোথিত এক অমোঘ অনুভূতি। একুশের চেতনা বুকে ধারণ করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ভাষার গৌরব ও মর্যাদা পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।মাতৃভাষা হোক আমাদের অহংকার, আমাদের প্রাণের স্পন্দন।



