।। মিতা দাসপুরকায়স্থ।।
শিলচর, ২ ফেব্রুয়ারি : পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার বসিরহাট–টাকি সংযোগপথের কাছাকাছি, টাকি শহর থেকে প্রায় পাঁচ-ছয় কিলোমিটার দূরে এক প্রত্যন্ত গ্রামীণ অঞ্চলে দাঁড়িয়ে আছে ঘোষবাড়ি। একসময় যা ছিল নিভৃত পারিবারিক বসতভিটে, আজ তা রূপ নিয়েছে পরিকল্পিত সৌন্দর্য, পর্যটন, ব্যবসা ও সমাজসেবার এক বিরল সমন্বয়ে। গ্রামবাংলার শান্ত প্রকৃতির কোলে গড়ে ওঠা এই স্থানটি এখন দূরদূরান্তের মানুষের কাছে পরিচিত এক আকর্ষণীয় অবকাশকেন্দ্র হিসেবে।
ঘোষবাড়িতে পা রাখলেই প্রথমে চোখে পড়ে সাজানো ফুলের বাগান, ছায়াঘেরা পথ আর ছোট-বড় জলাশয়ের শান্ত উপস্থিতি। তিনপাশে বিস্তৃত শস্যক্ষেত, বিশেষ করে সর্ষের হলুদ ফুলে মোড়া প্রান্তর, যেন প্রকৃতির নিজস্ব রঙে আঁকা এক প্রশান্ত চিত্রপট। এই পরিবেশ শহরের কোলাহল থেকে আসা দর্শনার্থীদের মনে এনে দেয় প্রশ্বাসের অবকাশ—যেন একদিনের জন্য হলেও মানুষ আবার প্রকৃতির কাছে ফিরে আসে।
এই মনুষ্যকৃত প্রকৃতিসদৃশ আবরণের মধ্যেই নির্মিত হয়েছে অভিনব স্থাপত্য। মিশরের পিরামিডের আদলে গড়ে ওঠা একটি দর্শনীয় অংশে নামমাত্র প্রবেশমূল্যে মানুষ ঘুরে দেখতে ও ছবি তুলতে পারে। তার পাশেই রয়েছে গ্লাসের ভূলভুলাইয়া—আয়নার বিভ্রমে তৈরি এক রোমাঞ্চকর পরিসর, যেখানে প্রবেশ করলে বাস্তব আর প্রতিবিম্বের মাঝখানে দাঁড়িয়ে মানুষ নিজেকেই যেন নতুন করে আবিষ্কার করে। শিক্ষা, কৌতূহল ও বিনোদনের এই সহাবস্থান ঘোষবাড়িকে সাধারণ পার্কের চেয়ে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
ঘোষবাড়ির একদিকে সাজানো পার্ক, যেখানে শিশুদের খেলাধুলা ও বয়স্কদের বিশ্রামের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রবেশপথেই চোখে পড়ে পাখির আবাস ও প্রদর্শনী—বিভিন্ন প্রজাতির পাখির সমাবেশ প্রকৃতিপ্রেমীদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। ছোট-বড় জলাশয়গুলিকে ঘিরে রঙিন ফুলের সারি পরিবেশকে আরও মনোরম করে তুলেছে। এখানে প্রকৃতি কেবল সাজসজ্জার অনুষঙ্গ নয়, বরং এক ধরনের নীরব শিক্ষাগুরু।

পিকনিকপ্রিয় মানুষের জন্য ঘোষবাড়ির আর এক বড় আকর্ষণ তার সুবিন্যস্ত পিকনিক স্পট। বাঁশঝাড় দিয়ে ঘেরা নির্দিষ্ট এলাকায় রান্না-বান্নার জন্য সম্পূর্ণ পরিকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে। বাসনপত্র, উনুন ও রান্নার প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সবই সেখানে প্রস্তুত থাকে, ফলে বাইরে থেকে আলাদা করে কিছু নিয়ে আসার ঝামেলা নেই। পরিবার কিংবা বন্ধুদের দল নির্বিঘ্নে এখানে সময় কাটাতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিশাল পার্কিং ব্যবস্থা, যেখানে গাড়ি রাখার জন্য আলাদা কোনো ফি দিতে হয় না। দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের জন্য অতিথিশালার ব্যবস্থাও রয়েছে, যা এই স্থানটিকে পূর্ণাঙ্গ পর্যটনকেন্দ্রের রূপ দিয়েছে।
খাদ্যসংস্কৃতির ক্ষেত্রেও ঘোষবাড়ি বৈচিত্র্যময়। একদিকে রয়েছে সাজানো রেস্টুরেন্ট, অন্যদিকে ঠেলাগাড়িতে সাজানো নানারকম খাবারের সম্ভার। গ্রাম্য স্বাদ থেকে আধুনিক খাবার—সবই এখানে মেলে। কিন্তু সবচেয়ে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ হলো ‘গরিবের হাট’। এখানে স্বল্প আয়ের মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য পাইকারি দামের থেকেও কম মূল্যে কিনতে পারেন। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই এখানে বাজার করতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একটি শপিং মল, যেখানে ঘর সাজানোর সামগ্রীসহ নানান পণ্য বিক্রি হয়। ফলে বিনোদন, আহার ও কেনাকাটা—সবকিছুর সুযোগ এক জায়গাতেই মিলছে।
ঘোষবাড়ির সবচেয়ে উজ্জ্বল ও মানবিক দিক তার অন্ন পরিষেবা। প্রতিদিন দুপুরবেলা এখানে বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। যে কেউ এসে খেতে পারে—ধনী বা দরিদ্রের কোনো ভেদাভেদ নেই। কোনওদিন ডাল-সবজি, কোনওদিন মাছ, কোনওদিন মাংস বা ডিম—এইভাবে প্রতিদিনের আহার ভিন্ন হলেও তা পরিপূর্ণ ও পুষ্টিকর। এই ব্যবস্থায় কেবল ক্ষুধা নিবারণ নয়, মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধের এক গভীর প্রকাশ ঘটে। অনেকের কাছে এটি আশ্রয়ের মতো, আবার পর্যটকের কাছে এটি মানবিক উদ্যোগের এক জীবন্ত নিদর্শন।

এই সমগ্র পরিকল্পনার নেপথ্যে রয়েছেন এক তরুণ উদ্যোক্তা—লালটু ঘোষ। নিজের মেধা, পরিশ্রম ও দূরদৃষ্টিকে কাজে লাগিয়ে তিনি কয়েক বছরের মধ্যেই এই এলাকাকে নতুন রূপ দিয়েছেন। অসংখ্য দোকান, রেস্টুরেন্ট ও পরিষেবা কেন্দ্র স্থাপন করে বহু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করেছেন । প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় হাজারখানেক পরিবার এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বলে স্থানীয়দের বক্তব্য। প্রত্যন্ত গ্রামীণ এলাকা হয়েও ঘোষবাড়ি আজ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় ভ্রমণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষণীয়—এত বড় পরিসরের বিনোদনকেন্দ্র হওয়া সত্ত্বেও ঘোষবাড়ি চত্বরে কোনো মদের দোকান নেই। ফলে পরিবেশটি পরিবার, নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ ও সুস্থ। আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শালীনতা ও সামাজিক দায়িত্ববোধ। একটি বাড়িকে কেন্দ্র করে এমন বহুমুখী উন্নয়ন সত্যিই বিস্ময়কর। এখানে ব্যবসায়িক বুদ্ধির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানবিক মনোভাব।
সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে যদি দেশের তরুণ প্রজন্ম এইভাবে নিজেদের মেধাকে কাজে লাগায়, তবে কেবল ব্যক্তিগত সাফল্য নয়—সমাজও সমৃদ্ধ হবে। বাড়ির জমি, গ্রামের পরিকাঠামো ও স্থানীয় সম্পদ—সবই উন্নয়নের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। এই মডেল দেখায়, বহু ছোট উদ্যোগ একত্রে কীভাবে বৃহৎ সামাজিক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
ঘোষবাড়ি আজ শুধুমাত্র একটি বিনোদনকেন্দ্র নয়,এটি এক ধরনের দর্শন—যেখানে সৌন্দর্য, ব্যবসা ও সেবা একসূত্রে গাঁথা। নামমাত্র প্রবেশমূল্যে দর্শনীয় স্থাপনা, রোমাঞ্চকর গ্লাসের ভূলভুলাইয়া, সস্তায় বাজার করার সুযোগ এবং বিনামূল্যে আহার—সব মিলিয়ে এটি সাধারণ মানুষের কাছে এক আশ্রয়স্থল। এখানে যারা আসে, তারা শুধু ঘুরে যায় না, সঙ্গে নিয়ে যায় এক মানবিক অনুপ্রেরণা।
ঘোষবাড়ির সঙ্গে যুক্ত আর এক বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা না বললে এই বিবরণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। টাকির টোটোচালক উৎপল দাস তাঁর টোটোতেই করে আমাকে ঘোষবাড়িতে নিয়ে গিয়েছিলেন। তিনি নিজে নিয়মিত এখানে এসে ‘গরিবের হাট’-এ বাজার করেন—এই কথাও আমাকে জানিয়েছেন। তাঁর অভিজ্ঞতায়, এখান থেকে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র অনেক কম খরচে পাওয়া যায়, ফলে তাঁর যথেষ্ট সাশ্রয় হয়। মাঝেমধ্যে তিনি এখানে এসে বিনামূল্যের দুপুরের আহারও গ্রহণ করেন। সেই দিন তিনিই আমার কয়েকটি ছবিও তুলে দেন। তাঁর এই কথাগুলির মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, ঘোষবাড়ি শুধু পর্যটনের জায়গা নয়, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গেও গভীরভাবে যুক্ত এক সহায়ক কেন্দ্র।
ঘোষবাড়ির সদস্যদের কর্মদ্যোগ বিচক্ষণতা এবং মানুষের শুভকামনা ও আশীর্বাদের শক্তিতেই ঘোষবাড়ি এবং তার স্রষ্টা আগামী দিনে আরও সমৃদ্ধ হোক, উত্তর ২৪ পরগনার এই প্রত্যন্ত অঞ্চল আলোর দিশা হয়ে দীর্ঘদিন টিকে থাকুক—এই কামনাই রইলো।



