মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ৩০ জানুয়ারি : পাথারকান্দি শিক্ষাখণ্ডের বাজারিছড়া গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত ৯৯০ নম্বর ছাগলমোয়া এলপি স্কুলের প্রধান শিক্ষক আব্দুল নূর তাঁর সুদীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করছেন আগামী ৩১ জানুয়ারি, শনিবার। সরকারি ছুটি থাকায় নির্ধারিত দিনের আগেই বৃহস্পতিবার স্কুল প্রাঙ্গণে তাঁকে এক জমকালো ও আবেগঘন সংবর্ধনার মাধ্যমে বিদায় জানানো হয়। স্কুল ছুটির পর শ্রেণিকক্ষেই আয়োজিত এই সংবর্ধনা সভায় উপস্থিত ছিলেন স্কুলের কচিকাঁচা ছাত্রছাত্রীদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী বিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা, প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী, স্কুলের সহকারী শিক্ষক-শিক্ষিকা, বিভিন্ন বিদ্যালয় থেকে আগত আমন্ত্রিত শিক্ষকবৃন্দ, অভিভাবকগণ এবং স্কুল পরিচালন সমিতির কার্যকর্তারা। পুরো অনুষ্ঠানজুড়ে ছিল আবেগ, কৃতজ্ঞতা আর স্মৃতিচারণার আবহ। নির্ধারিত সময়ে প্রধান শিক্ষক আব্দুল নূর বিদ্যালয়ে উপস্থিত হলে ছাত্রছাত্রীরা তাঁকে বিশেষভাবে স্বাগত জানিয়ে শ্রেণিকক্ষে নিয়ে আসে। স্থানীয় প্রবীণ ব্যক্তি আব্দুল জলিলের পৌরহিত্যে সংবর্ধনা সভার সূচনা হয়। সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে কালাছড়া ও বাজারিছড়া ক্লাস্টারের সিআরসিসি অজিত ঘোষ ও মনোজ দাশগুপ্ত, লোয়াইরপোয়া সেন্টার সেক্রেটারি সুমন্ত শুক্লবৈদ্য প্রমুখ বিদায়ী শিক্ষকের দীর্ঘ কর্মজীবনের নানা দিক তুলে ধরেন।
বক্তারা বলেন, “আব্দুল নূর বাস্তবিক অর্থেই শিক্ষার এক রূপকার। ছাগলমোয়ার মতো প্রত্যন্ত গ্রামে তিনি যেভাবে শিশুদের মনে শিক্ষার আলো জ্বালিয়েছেন, তা নিঃসন্দেহে অনস্বীকার্য অবদান।” উল্লেখ করা হয়, ১৯৯২ সালের ১৭ জুলাই তিনি এই বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা জীবনের সূচনা করেন। সে সময় এলাকায় যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত বেহাল। প্রতিদিন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে, কাদামাখা দুর্গম পথ অতিক্রম করে বিদ্যালয়ে পৌঁছাতেন তিনি। কিন্তু কখনো ক্লান্তি বা অভিযোগ তাঁর মুখে শোনা যায়নি। ছুটি ব্যতীত নিরলসভাবে তিনি তাঁর দায়িত্ব পালন করে গেছেন।

এই দীর্ঘ সময়ে তিনি কেবল পড়ুয়াদের প্রিয় শিক্ষকই নন, স্থানীয় এলাকার এক অভিভাবকের মতো হয়ে উঠেছিলেন। বক্তারা আবেগভরে তাঁর কর্মজীবনের শেষ প্রান্তে এসে সেই সব স্মৃতি রোমন্থন করেন।অনুষ্ঠানের মধ্যমণি বিদায়ী প্রধান শিক্ষক আব্দুল নূর ভারাক্রান্ত হৃদয়ে তাঁর প্রিয় ছাত্রছাত্রীদের উদ্দেশ্যে উজ্জ্বল ভবিষ্যতের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, “পড়ুয়ারা যেন মন দিয়ে পড়াশোনা করে এবং শিক্ষকদের উপদেশ মেনে চলে।” একই সঙ্গে সহকর্মীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা প্রকাশ করে তিনি বলেন, সরকারি বিধি অনুযায়ী তিনি অবসর গ্রহণ করছেন ঠিকই, কিন্তু এই মহান পেশা ও বিদ্যালয়ের সঙ্গে তাঁর আত্মিক সম্পর্ক কখনোই ছিন্ন হবে না। এর আগে অনুষ্ঠানে ছাত্রছাত্রী, স্কুল পরিচালন সমিতির সদস্য ও অভিভাবকরা বিদায়ী শিক্ষকের হাতে উপহার সামগ্রী তুলে দেন। সেই মুহূর্তে অনুষ্ঠানের সার্বিক পরিবেশ হয়ে ওঠে অত্যন্ত আবেগঘন। উপস্থিত সকলেই অশ্রুসজল চোখে এই আদর্শ শিক্ষককে বিদায় জানান।
এদিনের অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তাঁর সহধর্মিণী নুরেমা বিবি, বড়বোন মতি বিবি, শিক্ষক শুভজিৎ পাল, আব্দুর রহিম, জাহান উদ্দিন, সমরজিত চৌহান, প্রাক্তন শিক্ষক দীগেন্দ্র সিংহ, বিশিষ্ট ব্যক্তি চাউরেন সিংহ, অজয় সূত্রধর। স্থানীয়দের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন আব্দুল মতিন, বিলাল আহদ, আব্দুল জলিল, আমির আলি, সুরমান আলি, মফিক মিয়া, এসএমসি সভাপতি সেলিম উদ্দিন, জহর উদ্দিন, রিনা বেগম, শিবানী নাথ প্রমুখ।



