বৃহত্তর পাথারকান্দিতে আনন্দ-উচ্ছ্বাস আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে উদযাপিত পবিত্র ঈদ-উল ফিতর

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ২১ মার্চ : ত্যাগ, সংযম ও আত্মশুদ্ধির এক মাসব্যাপী সাধনার পর খুশির বার্তা নিয়ে উপস্থিত হয় পবিত্র ঈদ-উল ফিতর। সেই আনন্দঘন উৎসবকে ঘিরে শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দি বিধানসভা জুড়ে এ বছরও সৃষ্টি হয় এক অনন্য আবহ যেখানে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য মিশে যায় উৎসবের প্রাণোচ্ছল উচ্ছ্বাসে। শনিবার সকাল হতেই গ্রামের পথঘাট, শহরের অলিগলি—সবখানেই দেখা যায় উৎসবের প্রস্তুতি। ছোট্ট শিশু থেকে প্রবীণ মানুষ—সকলেই নতুন পোশাকে সজ্জিত হয়ে ঈদের নামাজ আদায়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেন নিজ নিজ ঈদগাহ ময়দানের দিকে। পাথারকান্দির বৃহত্তর কটামণি, আছিমগঞ্জ কাঁঠালতলি, চান্দখিরা, ডেঙারবন্দ, টিলাবাড়ি, জোড়বাড়ি, ডেফলআলা, মামবাড়ি, মূরবন্দ, নাগ্রা, ঝেরঝেরি, সেম্বুনগর, রাঙ্গামাটি, বড়ছবড়ি, লোয়াইরপোয়া, জালানগর, বৈঠাখাল, বাজারিছড়া, চন্দ্রপুর, কালাছড়া, ছগলমোহা সহ অসংখ্য গ্রাম ও জনপদে একযোগে অনুষ্ঠিত হয় ঈদের জামাত। ঈদগাহ ময়দানগুলো সকাল থেকেই ভরে ওঠে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিদের উপস্থিতিতে।নামাজ শেষে ইমাম সাহেবের খুতবা ও দোয়ার মাধ্যমে দেশ, জাতি এবং বিশ্ব মানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনা করা হয়। নামাজের পরপরই শুরু হয় হৃদয়স্পর্শী দৃশ্য—কোলাকুলি, করমর্দন ও আন্তরিক শুভেচ্ছা বিনিময়। যেন সব ভেদাভেদ ভুলে এক সুতোয় গাঁথা হয়ে যায় সমগ্র সমাজ। ঈদের আনন্দ শুধু নামাজেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা ছড়িয়ে পড়ে প্রতিটি ঘরে, প্রতিটি পরিবারে। ঘরে ঘরে রান্না হয় সেমাই, পোলাও, মাংসসহ নানান মুখরোচক খাবার।

আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া, মিষ্টিমুখ করা এবং শিশুদের মধ্যে ঈদি বিতরণ সব মিলিয়ে দিনটি হয়ে ওঠে আনন্দের এক অনন্য উৎসব।ঈদের বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে বরাবরের মতো এ বছরও কটামনি বাজারে বসে ঐতিহ্যবাহী ঈদ মেলা। অসম, মিজোরাম ও ত্রিপুরা সীমান্তবর্তী এই জনপদের মেলাটি যেন এক মিলনমেলায় পরিণত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে আগত মানুষের ভিড়ে জমে ওঠে পুরো এলাকা। শিশুদের জন্য বিভিন্ন খেলনা, নাগরদোলা, মিষ্টি ও ফাস্টফুডের দোকান—সবকিছু মিলিয়ে এক বর্ণিল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। মেলায় ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় পরিবার-পরিজনসহ আগত অসংখ্য মানুষকে। নতুন পোশাক পরে শিশুদের উচ্ছ্বাস, তরুণদের আনন্দ আর বয়োজ্যেষ্ঠদের প্রশান্তি সব মিলিয়ে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য যেন ফুটে ওঠে এই মিলনমেলায়।

এছাড়াও ঈদ উপলক্ষে বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন আয়োজন করে বিশেষ অনুষ্ঠান। কোথাও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, কোথাও দুঃস্থ ও অসহায় মানুষের মাঝে খাদ্য ও বস্ত্র বিতরণ সব মিলিয়ে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়।

এদিকে, এত বড় উৎসবকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাথারকান্দি থানার পুলিশ প্রশাসন ছিল সর্বদা তৎপর। ঈদের আগের দিন থেকেই বাজার ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জোরদার টহলদারি চালানো হয়। ঈদের দিন ভোর থেকে প্রতিটি ঈদগাহ ময়দান, মেলা প্রাঙ্গণ ও ব্যস্ত এলাকাগুলোতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়।কটামনি বাজারে বিশেষভাবে নজরদারি বাড়ানো হয় এবং ট্রাফিক ব্যবস্থাও দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। পুলিশের পাশাপাশি বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। প্রশাসনের এই সমন্বিত উদ্যোগের ফলে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হয় ঈদের সকল আয়োজন।কটামনি বাজার কমিটির সভাপতি আব্দুল মান্নান প্রশাসনের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন,ঈদ আমাদের কাছে শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের প্রতীক। পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো, আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে মিলিত হওয়া এসব মুহূর্তই আমাদের জীবনের প্রকৃত আনন্দ এনে দেয়।

উল্লেখ্য, পাথারকান্দির পাশাপাশি রামকৃষ্ণনগর, বদরপুর, উত্তর করিমগঞ্জ ও দক্ষিণ করিমগঞ্জসহ শ্রীভূমি জেলার সর্বত্রই একই উৎসাহ-উদ্দীপনায় পালিত হয় পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। প্রতিটি গ্রাম ও মহল্লার ঈদগাহ ময়দান ও মসজিদগুলোকে নান্দনিকভাবে সাজিয়ে তোলা হয়। বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হয় আকর্ষণীয় তোরণ, যা উৎসবের সৌন্দর্যকে আরও বহুগুণে বৃদ্ধি করে। সব মিলিয়ে, ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, সামাজিক সম্প্রীতি এবং সার্বজনীন আনন্দের এক অপূর্ব সমন্বয়ে পাথারকান্দিতে এবারের ঈদ-উল ফিতর উদযাপন সম্পন্ন হয়েছে। মানুষের মুখে হাসি, হৃদয়ে ভালোবাসা আর সমাজে সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়ে শেষ হলো এই পবিত্র উৎসব।ঈদের এই আনন্দ যেন সবার জীবনে বয়ে আনে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধির বার্তা এই কামনাতেই শেষ হয় দিনের সকল আয়োজন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *