ভক্তি, ঐতিহ্য ও আনন্দে মুখর বাজারিছড়া, বারুণী মেলায় উপচে পড়া জনসমাগম

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি।
বরাক তরঙ্গ, ১৭ মার্চ : বাজারিছড়ায় ঐতিহ্য, ভক্তি আর গ্রামীণ সংস্কৃতির এক অপূর্ব মেলবন্ধনে জমে উঠল পবিত্র বারুণী মেলা। চৈত্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের ত্রয়োদশ তিথিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত এই উৎসব সনাতনী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের কাছে এক গভীর আধ্যাত্মিক তাৎপর্য বহন করে। প্রতি বছরের মতো এবারও ভোরের প্রথম আলো ফুটতেই বাজারিছড়ার লঙ্গাই নদীর ঘাটে নেমে আসে ভক্তদের ঢল। পুণ্য লাভের আশায় বহু মানুষ পবিত্র স্নান সারেন, অনেকে আবার পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করেন। ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, এই দিনে গঙ্গাস্নান ও গঙ্গাপুজা বিশেষ ফলপ্রদ বলে মনে করা হয়, আর সেই বিশ্বাস থেকেই নদীর ঘাটে দেখা যায় ভক্তিমূলক এক আবহ। বারুণী উপলক্ষে বাজারিছড়ার ভিতর বাজার এলাকাজুড়ে বসে ঐতিহ্যবাহী এই মেলা, যা শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানই নয়, বরং স্থানীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতিরও এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সকাল থেকেই একে একে ভিড় জমাতে শুরু করেন স্থানীয় ও দূরদূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীরা। রঙিন পসরা সাজিয়ে বসেন তারা বাঁশের তৈরি মাছ ধরার বিভিন্ন সরঞ্জাম, তালের পাখা, বাচ্চাদের জন্য বাঁশের বাঁশি, লোহার তৈরি নিত্যপ্রয়োজনীয় গৃহস্থালী সামগ্রী, শীতল পাটি সহ নানা আকর্ষণীয় জিনিসে ভরে ওঠে মেলার প্রতিটি কোণা। তবে এবারের মেলায় একটি ভিন্ন চিত্রও চোখে পড়ে। আগের মতো তালের পাখা বা বাঁশের বাঁশির প্রাচুর্য কিছুটা কম থাকলেও মাছ ধরার সরঞ্জাম ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর চাহিদা ছিল চোখে পড়ার মতো। সেই সঙ্গে বাজারের চড়াদামের প্রভাবও স্পষ্ট—প্রায় সব পণ্যের দামই বেড়েছে, যা ক্রেতাদের মধ্যে কিছুটা প্রভাব ফেললেও উৎসবের আমেজে তার খুব একটা ছাপ পড়েনি। পাথারকান্দি কেন্দ্রের সলগই ও বাজারিছড়া এলাকাজুড়ে আয়োজিত এই বারুণী মেলায় ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সামাজিক মিলনমেলার পরিবেশ তৈরি হয়।

বাজারিছড়া শিববাড়িতে সকাল থেকেই ভক্তদের ভিড় লক্ষ্য করা যায়, যেখানে পূজার্চনা ও প্রার্থনায় মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।প্রকৃতিও যেন এদিন উৎসবের সঙ্গেই তাল মিলিয়েছে। দু’দিন আগেই আকস্মিক কালবৈশাখীর ঝড়ে মেলা পরিচালন সমিতি ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মনে দুশ্চিন্তার ছায়া নেমে এসেছিল। কিন্তু সৌভাগ্যবশত, বারুণীর দিন সকাল থেকেই আকাশ ছিল নির্মল ও মেঘমুক্ত। দিন গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে ভিড়ও ক্রমশ বাড়তে থাকে, আর বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত উপচে পড়া জনসমাগমে মেলা প্রাঙ্গণ প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে। নিরাপত্তার দিক থেকেও ছিল যথেষ্ট কড়াকড়ি। বাজারিছড়া থানার পুলিশ প্রশাসন সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখায় মেলায় কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি, যা দর্শনার্থীদের স্বস্তি দিয়েছে।সব মিলিয়ে, ধর্মীয় আচার, গ্রামীণ ঐতিহ্য, কেনাবেচা আর আনন্দ-উল্লাসে ভরপুর এই বারুণী মেলা আবারও প্রমাণ করল এটি শুধু একটি উৎসব নয়, বরং বৃহত্তর বাজারিছড়া এলাকার মানুষের আবেগ, বিশ্বাস ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। বড়দের পাশাপাশি ছোটরাও প্রাণভরে উপভোগ করেছে এই মিলনমেলা, আর উৎসবের আনন্দে মুখরিত হয়ে উঠেছে গোটা অঞ্চল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *