বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজকে অসম সরকারের ঐতিহাসিক উপহার

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি। 
বরাক তরঙ্গ, ১৩ মার্চ : অসমের বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের জন্য রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে গৃহীত এই পদক্ষেপকে সম্প্রদায়টির ভাষা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার উন্নয়নে এক ঐতিহাসিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, পীযূষ হাজরিকা ও রণোজ পেগুর উদ্যোগ ও প্রচেষ্টায় এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়িত হয়েছে বলে জানা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে চলা দাবি ও আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের সার্বিক উন্নয়ন, ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের শিক্ষার কথা মাথায় রেখে রাজ্য সরকার একাধিক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এই সিদ্ধান্তকে সমাজের বিভিন্ন সংগঠন, সাংস্কৃতিক মহল এবং শিক্ষাবিদরা আন্তরিকভাবে স্বাগত জানিয়েছেন।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, গুয়াহাটির চন্দ্রপুর রাজস্ব চক্রের অধীনে ৫ বিঘা ৩ কাঠা ১ লেচা জমি বরাদ্দ দিয়ে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের জন্য একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ করা হবে। এই জমিতে নির্মিত হবে অত্যাধুনিক ‘বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভবন’। ভবিষ্যতে এটি সম্প্রদায়টির শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করবে।

প্রস্তাবিত এই ভবনে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, গবেষণা কার্যক্রম, সাহিত্যচর্চা, সেমিনারসহ বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ থাকবে। সমাজের বিশিষ্টজনদের মতে, এই ভবন ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করতে সহায়তা করবে।

শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, শিক্ষাক্ষেত্রেও রাজ্য সরকার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রি-প্রাইমারি ও প্রাইমারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভাষা অন্তর্ভুক্ত করা হবে। এর ফলে ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীরা মাতৃভাষায় শিক্ষালাভের সুযোগ পাবে, যা তাদের বুদ্ধিবিকাশ ও সাংস্কৃতিক পরিচয় গঠনে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।
এই বিষয়ে ইতিমধ্যে রাজ্যপালের পক্ষ থেকে বিভাগীয় কমিশনার ও সচিব নারায়ণ কোঁয়রের কাছে আনুষ্ঠানিক নির্দেশ পাঠানো হয়েছে। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলে খুব শিগগিরই বিদ্যালয়গুলোতে মাতৃভাষায় শিক্ষাদান চালু হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্তকে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজের বিভিন্ন সংগঠন স্বাগত জানিয়েছে। বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি উন্নয়ন পরিষদের অধ্যক্ষা রিতা সিনহা এই উদ্যোগকে সমাজের জন্য “নতুন দিগন্তের সূচনা” বলে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, এটি শুধু একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও ভাষাগত অধিকারের স্বীকৃতি।

এছাড়াও বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ইউনাইটেড ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের কার্যকরী সভাপতি বিমল সিনহা, সহ-সভাপতি সুশান্ত সিনহা সহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দও সরকারের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের মতে, এই পদক্ষেপ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে নিজেদের ভাষা ও ঐতিহ্যকে আরও শক্তিশালীভাবে তুলে ধরতে সহায়ক হবে।

এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের জন্য তারা মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, পীযূষ হাজরিকা, কেশব মহন্ত এবং রণোজ পেগুর প্রতিও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেছেন।

সমাজের প্রবীণদের মতে, নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও পরিচয় রক্ষার জন্য বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি সমাজ দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম চালিয়ে আসছে। সরকারের এই সিদ্ধান্ত সেই আন্দোলনেরই বাস্তব রূপ।
সব মিলিয়ে গুয়াহাটিতে বিষ্ণুপ্রিয়া মণিপুরি ভবন নির্মাণ এবং বিদ্যালয়ে মাতৃভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত সম্প্রদায়টির সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত বিকাশে এক নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *