বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তে বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা

২৪ নভেম্বর : বাউল-পালাকার-বয়াতিদের ওপর আক্রমণ যেন কিছুতেই থামছে না। দেশের বাউল সম্প্রদায় বিপদাপন্ন। অনেক দিন ধরেই বাউল সম্প্রদায়ের ওপর হামলা চলছে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। কোথাও তাদের মঞ্চ ভেঙে দেওয়া হচ্ছে; কোথাওবা কেটে দেওয়া হচ্ছে বাউল গুরুর চুল। কোথাও পুড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে বাউলের বাসস্থান ও বাদ্যযন্ত্র।

শুধু গানের মধ্য দিয়ে সৃষ্টিকর্তা ও জগৎ সম্পর্কে প্রশ্ন এবং তার যৌক্তিক ব্যাখ্যা তুলে ধরার অপরাধে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেফতারের নজিরও এ দেশে তৈরি হয়েছে। কেন? বাউলের অপরাধ কী? বাউল পন্থা গ্রহণ করতে কারও ওপর কি বল প্রয়োগের উদাহরণ আছে? বাউল কি কারও কিছু কেড়ে খায়? না, কিছুই করে না। সব ধর্মের ঊর্ধ্বে মানুষের বড়ত্ব ঘোষণা করে বাউল। সেই বড়ত্বে কোনো অহংকার নেই। নিরহংকার না হয়ে বাউল পথে নামা সম্ভব নয়। নিজের অবনমিত অবস্থান প্রকাশ ও প্রচার করতে বাউলকে ভিক্ষায় নামতে হয়। বাউল নিঃস্ব, নির্লিপ্ত জীবনের সাধনা করে।

ধর্মাধর্মের বিভেদের বাইরে আত্ম-অনুসন্ধানে মগ্ন বাউল কারও ক্ষতির কারণ কখনও হয়েছে বলে জানা যায়নি। বাউল জীবন মানে হিংসা-বিদ্বেষ-কাম-কামনার ঊর্ধ্বে ‘জ্যান্ত মরা’ মানুষের স্থিরতা অর্জনের অধ্যবসায়। মরদেহ যেমন পার্থিব মোহমুক্ত, তেমনি মরদেহের আধ্যাত্মিকতা বাউল জীবনের লক্ষ্য। প্রকৃত বাউল মহাপ্রকৃতির অংশ। গান তাঁর জীবনযাপন করার উপায়।

বাউল গানের কারণে বাংলাদেশের মর্যাদাপূর্ণ পরিচয় আছে বিশ্ব পরিসরে। বাউল গানকে জাতিসংঘ বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা প্রদান করেছে। সারা দুনিয়ার হাজারো পরিবর্তনশীল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের (ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ) বৈচিত্র্যময় ধরন থেকে মাত্র ৪৩টি ঐতিহ্য চিহ্নিত করতে গিয়ে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা (ইউনেস্কো) বাউল গানকে অসাধারণ সৃষ্টি বলে আখ্যা দিয়েছে।

এই অসাধারণত্ব বংশপরম্পরায় তৈরি হয় না; গুরু-পরম্পরায় তৈরি হয়। মুসলমানের সন্তান মুসলমান হয়, হিন্দুর সন্তান হিন্দু। কিন্তু জন্মসূত্রে বাউল হওয়ার উপায় নেই। বাউল হয়ে উঠতে গুরুর পথ অনুসরণের কঠোর সাধনা করতে হয়। আত্মশুদ্ধির পথে ধ্যানস্থ হতে হয়। গুরুর দীক্ষা মেনে মৃত মানুষের মতো স্রষ্টার দরবারে লীন হওয়ার সাধ্য থাকলে তবেই বাউল হওয়া যায়। হাজার বছর ধরে এই ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠা পেয়েছে এবং তা চলমান। প্রাচীনতম সাহিত্য নিদর্শন চর্যাপদেও বাউলের উল্লেখ আছে ‘বাজিল’ বা ‘বাজুল’ নামে। বাস্তবিক কারণেই বাউল গান বিশ্বসমাজে বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য; বিশ্বের অমূল্য সম্পদ; বাংলাদেশের পরিচয়-গৌরব। বাউলের ওপর হামলা তাই বিশ্ব ঐতিহ্যের ওপর হামলা। বাংলাদেশের জাতীয় সংস্কৃতির ওপর হামলা।
খবর : দৈনিক ইনকিলাব পত্রিকা ডিজিটাল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *