মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১২ জানুয়ারি : শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গে অসমের গ্রামবাংলায় যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার ঘটে। কুয়াশা-মোড়া সকাল, নরম রোদ, আর তারই সঙ্গে ভোগালি বিহুকে ঘিরে উৎসবের উচ্ছ্বাস সব মিলিয়ে এই সময়টা অসমবাসীর কাছে এক বিশেষ আবেগের নাম। আর এই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ঐতিহ্যবাহী ভেলাঘর ও মেড়ামেড়ির ঘর। চলতি বছর সেই চিরচেনা উৎসবের রূপেই যুক্ত হয়েছে অভিনব সৃজনশীলতা ও আধুনিক ভাবনার ছোঁয়া, যা শ্রীভূমি জেলার বদরপুর অঞ্চলের ৩০০ বছরের পুরোনো বরগুল গ্রামকে এনে দিয়েছে রাজ্যজুড়ে বিশেষ পরিচিতি। ভোগালি বিহুকে সামনে রেখে বরগুল গ্রামে গ্রামবাসীদের সম্মিলিত উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে এক ব্যতিক্রমী ভেলাঘর ভারতের নতুন সংসদ ভবনের আদলে। বাঁশ, কাঠ, খড় ও বেতের মতো ঐতিহ্যবাহী উপকরণ ব্যবহার করে নিখুঁত স্থাপত্যশৈলীতে গড়ে তোলা এই ভেলাঘর যেন ক্ষুদ্রাকৃতির সংসদ ভবনেরই প্রতিচ্ছবি। গম্বুজের নকশা, স্তম্ভের বিন্যাস ও সামগ্রিক কাঠামো দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন দর্শনার্থীরা।

গ্রামীণ পরিবেশে দাঁড়িয়ে এমন আধুনিক ভাবনার প্রতিফলন নিঃসন্দেহে গ্রামবাসীদের সৃজনশীলতা ও দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।এতেই থেমে থাকেনি বরগুল। একই এলাকায় নির্মাণ করা হয়েছে আরও একটি ব্যতিক্রমী ভেলাঘর, যা জনপ্রিয় অসমিয়া শিল্পী জুবিন গর্গের বাদ্যযন্ত্রের আদলে তৈরি। সঙ্গীত ও লোকসংস্কৃতির মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা এই ভেলাঘর ইতিমধ্যেই সঙ্গীতপ্রেমী ও তরুণ প্রজন্মের কাছে বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে। শিল্পীর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা জানাতে আয়োজকদের পক্ষ থেকে জুবিন গর্গের ছবিতে প্রদীপ প্রজ্বালন ও ফুল দিয়ে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। গ্রামবাসী থেকে শুরু করে দূরদূরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরাও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদন করছেন, যা এই উদ্যোগকে আরও আবেগঘন করে তুলেছে।

সোমবার বিকেলে প্রতিবেদককে কাছে পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা তারা জানান ভেলাঘর কেবল উৎসব উদযাপনের কাঠামো নয় এটি সামাজিক ঐক্য, পরিশ্রম ও সৃজনশীল প্রকাশের এক গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। কয়েক সপ্তাহ ধরে দিন-রাত এক করে তরুণ, প্রবীণ ও শিশুরা মিলেই গড়ে তুলেছেন এই ভেলাঘরগুলো। শিশুদের কৌতূহল, তরুণদের উদ্দীপনা আর প্রবীণদের অভিজ্ঞতার সম্মিলনে বরগুল গ্রাম যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।অন্যদিকে, ভোগালি বিহুকে কেন্দ্র করে বদরপুর রেল শহর থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বরগুল, ঘিলাইযান, আদরকোনা ও বড়তল এই সমস্ত অসমিয়া অধ্যুষিত গ্রামগুলোতেও উৎসবের আমেজ এখন তুঙ্গে। গ্রামে গ্রামে জমজমাটভাবে চলছে ঐতিহ্যবাহী মেড়ামেড়ির ঘর নির্মাণ। ক্ষেতের পরিত্যক্ত জমিতে খড়, বাঁশ ও বেত দিয়ে তৈরি হচ্ছে এই ঘরগুলো, যা ভোগালী বিহুর অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ।বিগত দিন কয়েক থেকে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চলছে নির্মাণকাজ।তার ফাঁকে ফাঁকে গান, হাসি-ঠাট্টা আর আড্ডায় মুখর হয়ে উঠছে গোটা এলাকা। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবাই অংশ নিচ্ছেন এই কাজে কেউ খড় বহন করছেন, কেউ বাঁশ কাটছেন, আবার কেউ গানে-নাচে সকলকে উৎসাহিত করছেন। এই সম্মিলিত অংশগ্রহণেই যেন ফুটে উঠছে ভোগালী বিহুর মূল দর্শন ঐক্য, পরিশ্রম ও আনন্দ।প্রতিদিন জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ ভেলাঘর ও মেড়ামেড়ির ঘর দেখতে ভিড় জমাচ্ছেন। শিশু থেকে প্রবীণ সবার চোখেই উৎসবের আনন্দ আর কৌতূহল। অনেক দর্শনার্থী পরিবার-পরিজন নিয়ে এসে এই গ্রামীণ উৎসবের রূপ উপভোগ করছেন।

স্থানীয়দের মতে, আধুনিকতার প্রভাব সত্ত্বেও ভোগালী বিহুর ঐতিহ্য আজও বদরপুর অঞ্চলের এই গ্রামগুলোতে অটুট রয়েছে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা ভেলাঘর ও মেড়ামেড়ির ঘর নির্মাণ শুধু উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা নয় এটি সামাজিক বন্ধন, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও লোকজ ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। ভোগালি বিহুর প্রাক্কালে শ্রীভূমি জেলার বদরপুর অঞ্চলের এই গ্রামগুলো এখন যেন উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। খড়ের ঘরের চারপাশে জমে উঠেছে আনন্দের রোশনাই, যা নতুন প্রজন্মের মাঝেও অসমিয়া লোকসংস্কৃতির প্রতি গভীর ভালোবাসা ও গর্ববোধ জাগিয়ে তুলছে। ভোগালির আনন্দে মাতোয়ারা শ্রীভূমি এই সৃজনশীল উদ্যোগ নিঃসন্দেহে অসমীয়া লোকসংস্কৃতির ধারাবাহিকতায় এক স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে।



