বিকাশ চক্রবর্তীর আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত প্রসঙ্গে

।। সঞ্জীব দেবলস্কর।।
১২ ফেব্রুয়ারি : একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেবল বর্তমান নয়, তার আত্মপ্রকাশের ইতিহাসও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয় কোনও হঠাৎ প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ফল নয়— আমাদের দেশে  এটা একটি দীর্ঘ সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগ্রামেরই ফলশ্রুতি।  বিকাশ চক্রবর্তীর ‘আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত’ সেই প্রয়োজনীয় ইতিহাসকেই প্রথমবারের মতো সুসংহত ভাবে  পাঠকের সামনে হাজির করার প্রয়াস।

কাজটি অনেক আগেই হতে পারত, অনেকেই করতে পারতেন—কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তিনটি দশক পেরিয়ে গেলেও কেউ তা করে উঠতে পারেননি। সেই শূন্যস্থান পূরণ করলেন শিলচরের লব্ধপ্রতিষ্ঠ সাংবাদিক বিকাশ চক্রবর্তী, একক প্রয়াসে, প্রায় নীরব অধ্যবসায়েই। এই গ্রন্থের  সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব এখানেই—এটি নিশ্চিতই একটি বর্ণনামূলক ইতিহাস নয়, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের  ইতিহাস-বিকৃতির বিরুদ্ধে একটি সময়োচিত হস্তক্ষেপ।

আসাম বিশ্ববিদ্যালয় নিজের প্রয়োজনে তাৎক্ষণিক তথ্যসূত্র  অর্থাৎ রেডি রেফারেন্সের জন্য একটি ইতিহাস ছাড়াই দীর্ঘদিন চলেছে—এ কথা সত্য। কিন্তু সেই শূন্যতার সুযোগেই দেখা দিয়েছে নানা চক্রান্ত: প্রতিষ্ঠার কৃতিত্ব নিয়ে নতুন নতুন দাবিদার, দীর্ঘদিনের সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত বিশ্ববিদ্যালয়কে “আসাম আন্দোলনের ফসল” বলে চিহ্নিত করার প্রবণতা ইত্যাদি। ১৯৮৯ সালে সংসদে আইন পাশ হওয়ার পরও কীভাবে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকা থেকে দাবি উঠেছিল— কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়টি বরাকে নয় ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় স্থাপন  করতে হবে। শিলচরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন আটকে দিয়ে   তেজপুরে অনুরূপ আরেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়না, এবং সংসদে দ্বিতীয় আইন (তেজপুর বিশ্ববিদ্যালয় অ্যক্ট ১৯৯৩) পাশ না হওয়া পর্যন্ত আসাম বিশ্ববিদ্যালয়কে কার্যকর না করার চাপ—এ সমস্ত জটিল ও প্রায় বিস্মৃত অধ্যায় লেখক সূত্রাকারে তুলে ধরেছেন।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, বইটি বাহাত্তরের ভাষা-আন্দোলন, শিক্ষার প্রশ্নে  কেন্দ্র–রাজ্য টানাপোড়েন এবং দুই উপত্যকার সম্পর্ককে আবেগ নয়, তথ্যের আলোকে বিচার করেছে। এতে কোনো উগ্রতা নেই, আছে প্রামাণ্য সূত্র, সংবাদ প্রতিবেদন, সংসদীয় প্রক্রিয়ার বিবরণ এবং আন্দোলনের ভেতরের গতিবিধি। ফলে পাঠক বুঝতে পারেন—আসাম বিশ্ববিদ্যালয়  বরাক উপত্যকার মানুষের দীর্ঘ, বহুস্তরীয় এক সংগ্রামের ফল।

এই গ্রন্থ প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন নিয়ে বিক্ষিপ্তভাবে বহু নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লেখা হয়েছে—প্রেমেন্দ্রমোহন গোস্বামী, সুজিৎ চৌধুরী, শ্যামলেন্দু চক্রবর্তী, সতু রায়, ময়নুল হক বড়ভুইঞা (চিত্রশিল্পী), গৌতমপ্রসাদ  দত্ত এবং বর্তমান লেখকেরও কিছু লেখা সেই ধারার অন্তর্ভুক্ত। কিন্তু বিকাশ চক্রবর্তীর বইটি ব্যতিক্রম, কারণ তিনি প্রথমবার সেই বিচ্ছিন্ন লেখাগুলোর বাইরে গিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিবৃত্ত নির্মাণ করার প্রয়াস পেয়েছেন।

অবশ্য  বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সুবীর কর স্বতোপ্রণোদিত হয়েই একটি পূর্ণাঙ্গ ইতিহাস লিখেছিলেন, কোনও অজ্ঞাতকারণে বইটি আর প্রকাশিত হয়নি। এরপর আর কাউকেই আনুষ্ঠানিকভাবে এই দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। সেই প্রেক্ষাপটে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত শুধু একটি বই নয়, এটি একটি দায়িত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক দলিলও বটে। 

এই গ্রন্থ পাঠ্য হওয়া উচিত—বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ছাত্র, গবেষক এবং প্রশাসকের জন্যও। কারণ, নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্মকথা না জানলে এর প্রতি ভালোবাসা কী করেই বা জাগবে? যে সংগ্রামী প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টি অর্জিত হয়েছে এর সম্যক পরিচয় না পেলে বিশ্ববিদ্যালয়কে রক্ত ঘাম দিয়ে গড়ার কাজে মগ্ন না থেকে এর রূপকারদের উড়ু উড়ু মন নিয়ে বিমানবন্দরে ভিড় জমানো ছাড়া আর কী’ই বা করার থাকতে পারে?  পাণ্ডববর্জিত মফস্‌সলে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস তো এখনও জ্ঞান বিজ্ঞান চর্চায় জমজমাট আনন্দময় একটি প্রাণের হাট হিসেবে গড়ে উঠতে পারেনি।  বিকাশ চক্রবর্তীর ইতিবৃত্ত  সেই ঘাটতি পূরণের একটি প্রাথমিক প্রয়াস। কাজটি তিনি করেছেন—নীরবে, দৃঢ়তায়, তথ্যের প্রতি আনুগত্য রেখে।
এ বইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হল—আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে বরাক উপত্যকার সঙ্গে বড়ো জনজাতি ও ছাত্রসংগঠনগুলির সক্রিয় সহযোগিতার প্রসঙ্গের অবতারণা। লেখক স্পষ্ট করে দেখিয়েছেন, এই আন্দোলন কখনোই সংকীর্ণ কোনো ভাষা বা সম্প্রদায়ভিত্তিক দাবিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। বরাক উপত্যকার প্রতিবেশী বিভিন্ন ভাষিকগোষ্ঠী ছাড়াও  ছাত্রসংস্থা আকসা (ACKSA)  এ আন্দোলনে বড়ো ছাত্রসংস্থারও সক্রিয় সহযোগিতা পেয়েছিল।  বড়ো ছাত্রনেতা  উপেন্দ্রনাথ ব্রহ্মর সঙ্গে প্রদীপ দত্ত রায়ের যোগাযোগ করিয়ে দেন সাংবাদিক রবিজিৎ চৌধুরী—এই তথ্যটি আন্দোলনের আন্তঃউপত্যকাগত সংযোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে।

বিকাশ চক্রবর্তীর বইতে বরাক উপত্যকার এ আন্দোলনে সমর্থকের মধ্যে উল্লেখ রয়েছে রবিরাম ব্রহ্ম, প্রদীপ কুমার দৈমারি, প্রমিলারাণী ব্রহ্ম, বিশ্বজিৎ দৈমারি, হাগ্রামা মহিলারি প্রমুখের নাম—যা থেকে বরাক উপত্যকার সঙ্গে বড়ো জনজাতির সহযোগিতার একটি সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়। এ সূত্রে পাওয়া যায়  সেদিনের All Assam Tribal Students Union-এর সভাপতি (আজকের শিক্ষামন্ত্রী)  রণোজ পেগুর নাম,  যিনিও  সেদিন  আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবির প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানিয়েছিলেন। এই তথ্যগুলি সেই প্রচলিত ধারণাকে ভেঙে দিয়ে বুঝিয়ে দেয় যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন কেবল একটি মাত্র ভাষিকগোষ্ঠী কিংবা একটিমাত্র উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। আসাম বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনে ত্রিপুরার অবদান প্রসঙ্গেও লেখক একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক বিষয়ের  কথা তুলে ধরেছেন। কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য এককোটি জনসংখ্যার একটি ‘supporting base’-এর প্রয়োজন। সেদিন এ সমস্যার মূলোচ্ছেদ করতে  তৎকালীন ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী নৃপেন চক্রবর্তী মশাই প্রদীপ দত্তরায়ের অনুরোধে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের কাছে লিখিতভাবে তাঁর রাজ্যের ৩৫ লক্ষ মানুষের আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি সমর্থনের কথা জানান। এই তথ্যটি  আন্দোলনের বিস্তারভূমিকে  আরও স্পষ্ট করে।
এখানে লেখক সংক্ষেপে বরাক উপত্যকা বঙ্গসাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন এবং শিক্ষা সংরক্ষণ সমিতির ভূমিকার কথাও এনেছেন। তবে এ আন্দোলন যে এত ব্যাপক ছিল—যেখানে মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক, এম.ই., পাঠশালা ও মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকেরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন—তার আরও বিশদ বিবরণ থাকলে বইটির প্রামাণ্যতা আরও গভীর হতে পারত। শিক্ষাবিদ প্রেমেন্দ্রমোহন গোস্বামী যে নিজ সাধনা ও মনোবলের উপর ভর করে কিছু স্কুলশিক্ষক, সাহিত্যকর্মী, সাংবাদিক ও অরাজনৈতিক সমাজকর্মীকে জনগণকে বিশ্ববিদ্যালয়টা কী জিনিস তা বুঝিয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের চারিত্র্যলক্ষণটি কী হবে তা নিরূপন করেছেন, সবাইকে বুঝিয়েছেন এবং তাঁদের সঙ্গী করে  কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবিকে কাছাড় থেকে দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছিলেন—এই অধ্যায়টি আরও বিস্তৃতভাবে এলে আন্দোলনের  সঠিক চিত্রটি পাঠকের সামনে আরও উজ্জ্বল হতো।
আর বহু প্রতীক্ষার পর বিশ্ববিদ্যালয় কার্যত হাতের মুঠোয় এসে যাওয়ার পর যে বিরোধীচক্রের লম্ফঝম্প চলছিল—এও আলাদা করে বলার দাবি রাখে। প্রস্তাবিত দু’টি বিশ্ববিদ্যালয়ের রূপরেখা নিয়ে আসামের তৎকালীন উচ্চশিক্ষামন্ত্রী গোলক রাজবংশীর একটি নোট আমাদের দেখার সুযোগ হয়েছিল, যেখানে বরাকের বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য হাতে গোনা কয়েকটি লাইন লিখতেও তাঁর অনীহা ছিল স্পষ্ট—এটা  আজও স্মৃতিতে তিক্ত হাসির জন্ম দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়টি ‘উগ্র বাঙালিয়ানার চারণক্ষেত্র’ হয়ে উঠবে—এই আশঙ্কা একসময় আসামের একাংশ বুদ্ধিজীবী মহলে প্রবল ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বাস্তবতা দেখলে মনে হয়, বাঙালিয়ানা তো দূরের কথা বাঙালিবিরোধী মানসিকতাই যে  কোথাও কোথাও নতুন করে প্রশ্রয় পাচ্ছে এ বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ বিষয়ে ইতিপূর্বে বহু লেখা হয়েছে—সে পাতা আবার ওল্টানোর প্রয়োজন নেই।
সব মিলিয়ে, বিকাশ চক্রবর্তী রচিত এ বই  যদি  বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলনের  ইতিহাসচর্চায় সামান্য হলেও নতুন আগ্রহ সৃষ্টি করে, তাহলেই তার সার্থকতা। একসময় আশা করা হয়েছিল—এই বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে বরাকের ইতিহাস, সমাজতত্ত্ব, ভাষাতত্ত্ব, অর্থনীতি এবং উপত্যকাভিত্তিক বিজ্ঞানচর্চায় এক নতুন জোয়ার আসবে। এ সময়ের অন্যতম ইতিহাসবিদ অধ্যাপক জয়ন্তভূষণ ভট্টাচার্য কিংবা অন্যতম সাহিত্যতত্ত্ববিদ তপোধীর ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে যে সম্ভাবনার দিকগুলো  উন্মোচিত হয়েছিল, সেগুলিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এ মাটির প্রতি গভীর দায়বদ্ধতা ও মমত্ববোধ নিয়ে, স্বাধীনতা আন্দোলন ও ভাষা আন্দোলনের উত্তরাধিকার বহনকারী সুযোগ্য উত্তরসূরীর আবির্ভাবের জন্য আমাদের হয়তো আরও অনেকদিন অপেক্ষা করতে হবে। সময়টি যে আত্মকেন্দ্রিকতার, বিভ্রান্তির, নিশ্চেতনারও।

এই বইয়ের দোষত্রুটি খোঁজার সময় এখন নয়, লেখকের গবেষণা-পদ্ধতি বিশ্লেষণেরও সময় নয়। লেখক  মূলত বিশাল এক আন্দোলন ইতিহাসের প্রবহমান ধারাকে আটকে রাখা  অবরুদ্ধ জলস্রোতের মুখটি খুলে দেওয়ার সাহসী প্রয়াস নিয়েছেন। সেই উদ্যোগের জন্য বিকাশ চক্রবর্তী  অভিনন্দনেরই যোগ্য।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *