।। মিতা দাসপুরকায়স্থ ।।
১৬ ফেব্রুয়ারি : সেই সন্ধ্যাটি শুরুতে ছিল একেবারেই সাধারণ। কিন্তু একটি সামোভারের উপস্থিতি ধীরে ধীরে বদলে দিলো দৃশ্যপট। রূপালি ধাতব গায়ে সূক্ষ্ম অলঙ্করণ, তার ভেতর থেকে উঠতে থাকা উষ্ণ ধোঁয়া—সব মিলিয়ে যেন এক দূরবর্তী ভূগোল এসে দাঁড়ালো শিলচর শহরের মাঝখানে। সামোভারের চারপাশে জমে উঠলো কাশ্মীরের ইতিহাস, জলবায়ু ও জীবনযাপনের নীরব ভাষা।
কাশ্মীর থেকে আসা বিক্রেতার কাছেই জানা গেলো, এই পাত্রটির নাম সামোভার। ঐতিহ্যগতভাবে সামোভার তৈরি হয় তামা বা পিতল দিয়ে, কখনও কখনও রূপার প্রলেপে। গায়ে খোদাই করা লতা-পাতা, জ্যামিতিক নকশা ও ফুলের মোটিফ কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যের জন্য নয়—এগুলো কাশ্মীরি কারুশিল্পের দীর্ঘ ঐতিহ্যের নিদর্শন। ভারী অথচ শৈল্পিক এই সামোভার একাধারে ব্যবহারিক পাত্র ও চলমান শিল্পবস্তু।
সামোভারের মাঝখানে থাকে একটি চিমনি। সেই চিমনিতেই রাখা হয় জ্বলন্ত কয়লা। কয়লা ঠাণ্ডা হয়ে গেলে আবার নতুন জ্বলন্ত কয়লা দেওয়া হয়, যাতে খেওয়ার উষ্ণতা ও স্বাদ অক্ষুণ্ণ থাকে। এখানে আগুন কোনও তাড়াহুড়োর বিষয় নয়—বরং ধৈর্য, যত্ন ও ধারাবাহিকতার প্রতীক।
খেওয়া ও সামোভারের ইতিহাস কাশ্মীরে অত্যন্ত গভীর ও বহুস্তরীয়। ইতিহাসবিদদের মতে, খেওয়া কাশ্মীরে আসে প্রায় ১৪–১৫ শতকে, পারস্য ও মধ্য এশিয়ার সাংস্কৃতিক যোগাযোগের সূত্র ধরে। সুফি সাধক, বণিক ও পর্যটকদের মাধ্যমে কাশ্মীরে চা পান করার এই বিশেষ রীতি প্রবেশ করে।
বিশেষ করে পারস্যের সুফি সাধক মীর সৈয়দ আলি হামাদানি (১৪শ শতক) কাশ্মীরে শুধু ধর্মীয় চিন্তাই নয়, সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলেন পারস্যের খাদ্যাভ্যাস, পোশাক ও পানীয় সংস্কৃতি। সেই ধারাবাহিকতায় কেশর, মসলা ও সবুজ চা দিয়ে তৈরি দুধছাড়া পানীয়—খেওয়া—কাশ্মীরি সমাজে ধীরে ধীরে শিকড় গেড়ে বসে।
সামোভারও একই সূত্রে কাশ্মীরে আসে। মধ্য এশিয়া ও পারস্যে বহু আগে থেকেই সামোভার ব্যবহৃত হতো চা গরম রাখার জন্য। কাশ্মীরের দীর্ঘ শীত, বরফাচ্ছন্ন জীবনযাপন ও সামাজিক আড্ডার সঙ্গে সামোভার স্বাভাবিকভাবেই মিশে যায়। ফলে খেওয়া ও সামোভার—এই দুই উপাদান একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠে।

খেওয়া কাশ্মীরে কেবল অতিথি আপ্যায়নের পানীয় নয়। এটি মূলত শীতকালীন পানীয়, তবে অনেক পরিবারে শীতকালে প্রায় প্রতিদিনই খেওয়া পান করা হয়। সকালে বা বিকেলের আড্ডায় অতিথি এলে সম্মানসূচক পানীয় হিসেবে, বিবাহ, সামাজিক অনুষ্ঠান ও উৎসবে , পারিবারিক নীরব ও সরব কথোপকথনের সঙ্গী হিসেবে।
গ্রীষ্মকালে এর ব্যবহার তুলনামূলক কম হলেও শীত এলেই খেওয়া যেন কাশ্মীরি জীবনের ছন্দে ফিরে আসে। খেওয়ার উপকারিতাও উল্লেখযোগ্য। এটি শরীর উষ্ণ রাখে, হজমে সাহায্য করে, অ্যান্টি-অক্সিডেন্টে সমৃদ্ধ এবং মানসিক প্রশান্তি আনে। কেশর, এলাচ ও দারুচিনির সুবাস মন ও শরীর—দুয়ের ওপরই ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। তাই খেওয়া কেবল স্বাদের জন্য নয়, সুস্থতার দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।
আলাপে আলাপে জানা গেলো, কাশ্মীরে এক কাপ খেওয়ার দাম প্রায় ১০০ টাকা। শিলচরে সেই একই খেওয়া খেলাম ২০০ টাকায়। দামের পার্থক্য থাকলেও অভিজ্ঞতার ঘাটতি ছিল না। কারণ এখানে খেওয়া শুধু পানীয় ছিল না—এ ছিল শেখার সুযোগ, জ্ঞানলাভ আর সংস্কৃতির সঙ্গে সরাসরি সংযোগ।
আরও এক কাপ খেওয়া খাওয়ার ইচ্ছে জেগেছিলো কিন্তু বাস্তবের হিসেব এসে কল্পনার ওপর সূক্ষ্ম এক লক্ষণরেখা এঁকে দিলো—পার্টসের গণ্ডীর কথা মনে পড়তেই থামতে হলো। মনে মনে স্থির করলাম—কাশ্মীর গিয়ে অনেক কাপ খেওয়া খাবো। উৎসের কাছেই তার পূর্ণতা অনুভব করবো।
এই অভিজ্ঞতা আরও গভীর হয় কারণ সেদিন ছিল ভ্যালেন্টাইনস ডে। চারপাশে যখন ভালোবাসা মানে মানুষ, ফুল আর উপহার—আমার কাছে ভালোবাসা ধরা দিলো এক কাপ খেওয়ার রূপে। উষ্ণ, সংযত, গভীর। এক ধরনের নীরব রোমান্টিকতা ও মৃদু পুলক অনুভব করলাম। সেদিন বিক্রেতার সঙ্গে ছবিও তোলা হল। সেই ছবি কেবল মুখের নয়—তা ধারণ করে একটি সন্ধ্যা, একটি শেখা, একটি সাংস্কৃতিক সংলাপ। বাড়ি ফেরার পথে অনুভূতি হল — আজকের এই উষ্ণ খেওয়া আমার কাছে এখন শুধু পানীয় নয়, একটুকরো আনন্দময় উষ্ণতা।
সে সন্ধ্যার খেওয়া হয়ে উঠলো সংস্কৃতির সঙ্গে এক সংলাপ— যেখানে স্বাদ, ইতিহাস, নতুন নতুন কিছু জানা শেখা ও ব্যক্তিগত উপলব্ধি একসঙ্গে মিশে গেছে।



