লক্ষাধিক পুণ্যার্থীর সমাগম, নজিরবিহীন নিরাপত্তা বলয়ে প্রশাসন______
রাজীব মজুমদার ও দিলোয়ার বড়ভূইয়া, ভুবন।
বরাক তরঙ্গ, ১৫ ফেব্রুয়ারি : শিবচতুর্দশী উপলক্ষে বরাক উপত্যকার প্রাচীন তীর্থক্ষেত্র ভুবন তীর্থ-এ নেমেছে অগণিত ভক্তের ঢল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় চার হাজার ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এই পবিত্র পাহাড়শিখরে মহাদেবের দর্শনের আশায় দূরদূরান্ত থেকে পুণ্যার্থীরা ভিড় জমিয়েছেন। ভক্তি, বিশ্বাস ও ধর্মীয় আবেগে মুখরিত সমগ্র এলাকা যেন এক মহামিলনক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

পঞ্জিকা অনুযায়ী রবিবার বিকেল ৫টা ০৮ মিনিটে শুরু হয়েছে শিবচতুর্দশীর তিথি, যা ১৬ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৫টা ৩৪ মিনিট পর্যন্ত অব্যাহত থাকবে। এই শুভক্ষণকে কেন্দ্র করে কাছাড়, শ্রীভূমি ও হাইলাকান্দি সহ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল এবং পার্শ্ববর্তী মণিপুর থেকেও হাজার হাজার ভক্ত পাহাড়ে আরোহন করছেন। বয়স্ক নারী-পুরুষ থেকে শুরু করে শিশুদের কোলে নিয়ে মহিলাদেরও দুর্গম পথ পাড়ি দিতে দেখা গেছে—যা অটল ধর্মবিশ্বাসেরই প্রতিচ্ছবি।

ত্রিদর্শীর সকাল থেকেই পাহাড়মুখী পথ জনারণ্যে পরিণত হয়। অনেকে আগের দিনেই পূজা সেরে ফিরেছেন, আবার অনেকে মূল তিথিতে দর্শনের অপেক্ষায় পাহাড়ে অবস্থান করছেন। রবিবার সারাদিন ভক্তদের অবিরাম আগমন লক্ষ্য করা গেছে। মতিনগর ও কৃষ্ণপুর—এই দুই প্রধান পথ ধরে পুণ্যার্থীরা শিখরের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে “হর হর মহাদেব” ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে চারদিক।

পাহাড়ের পাদদেশে চরণ মন্দির সংলগ্ন এলাকা থেকে আমড়াঘাট–মতিনগর সড়ক পর্যন্ত দীর্ঘ যানবাহনের সারি সৃষ্টি হয়। কয়েক কিলোমিটার জুড়ে যানজট সামাল দিতে প্রশাসনকে বিশেষ ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। সন্ধ্যার পর বহু ভক্ত পায়ে হেঁটে আরোহন করেন, ফলে পাহাড়ি পথে এক অনন্য আধ্যাত্মিক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বাড়তি কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। আরোহনপথে পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া নজরদারি চলছে। মদ্যপ অবস্থায় বা মদ বহনকারীদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি রয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসা পরিষেবা, বিশুদ্ধ পানীয় জল, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ ও জরুরি সহায়তায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে।

ধর্মীয় বিশ্বাস অনুসারে, এই পবিত্র তিথিতে ভুবনেশ্বর মহাদেবের দর্শন পাপমোচন ও মোক্ষপ্রাপ্তির পথ সুগম করে। সেই বিশ্বাস নিয়েই হাজার হাজার ভক্ত কষ্টসাধ্য পাহাড়ি পথ অতিক্রম করছেন। শঙ্খধ্বনি, ধূপের সুবাস ও মন্ত্রোচ্চারণে পাহাড়জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে এক অলৌকিক আবহ।
প্রশাসনিক অনুমান, রবিবার সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত লক্ষাধিক পুণ্যার্থী পাহাড়ে উঠেছেন। ত্রিদর্শী ও শিবচতুর্দশী মিলিয়ে দুই দিনে আড়াই লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি সকাল থেকে ধাপে ধাপে ভক্তদের নামার প্রক্রিয়া শুরু হবে।
শিবচতুর্দশীর এই মহোৎসব আবারও প্রমাণ করল—আস্থা ও ভক্তিই মানুষের ঐক্যের শক্তি। শান্তি ও কল্যাণের প্রার্থনায় মুখর হয়ে উঠেছে সমগ্র তীর্থাঞ্চল।



