উচ্ছেদ, এসআর নিয়ে ক্ষোভের সুর টান্টুর উরুসে

বরাক তরঙ্গ, ৩০ জানুয়ারি : দক্ষিণ হাইলাকান্দি সহ অসমের বিভিন্ন জেলায় যেভাবে উচ্ছেদ অভিযান চলছে এবং রাজ্যজুড়ে এসআর-এর নামে যে অন্যায়ভাবে নাম কর্তনের নোটিশ তথা নাম কর্তন প্রক্রিয়া চলছে, এনিয়ে আওয়াজ উঠল টান্টুর বার্ষিক উরুস মহফিলে। বৃহস্পতিবার বরাকের অন্যতম টান্টুর পীর তথা ওলিয়ে কামিল শাহসুফি আল্লামা আব্দুল আজিজ চৌধুরী (রঃ) ও পীরে তরিকত শাহসুফি পীর আতাউর রহমান চৌধুরীর (রঃ) বার্ষিক উরুস মহফিল থেকে এই আওয়াজ উঠল। সংখ্যালঘু মুসলিমদের বেছে বেছে রাজ্যের বিজেপি সরকার উচ্ছেদ চালাচ্ছে। সঙ্গে এসআর-এর নামে ব্যাপক হারে মুসলিম ভোটারদের নাম ভোটার তালিকা থেকে কর্তন করার অপপ্রয়াস চলছে। তাই সরকারের এই কূটচাল থেকে মুসলিমদের খুব বেশি সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়।

লক্ষাধিক জড়ো হওয়া মানুষের সামনে টান্টুর উরুসে সরকারের বিরুদ্ধে এককথায় গর্জে উঠলেন একাধিক বক্তা। টান্টুর সাহেবজাদা মওলানা কারি আব্দুল বাসিত চৌধুরী বক্তব্য রাখতে গিয়ে রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সরব হন। তিনি বলেন, যুগ যুগ ধরে ইসলাম ধর্মকে মেটানোর ষড়যন্ত্র চলছে। তবে এই ষড়যন্ত্র মোটেই টিকবে না। পৃথিবী যতদিন আছে ততদিন ইসলাম ধর্ম থাকবে। তিনি রাজ্য সরকারের মুরব্বিকে সংযত থেকে রাজ্য পরিচালনার পরামর্শ দেন। হিন্দু-মুসলিম সবাইকে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রাজ্য চালালে রাজ্যে শান্তি এবং উন্নতি আসবে। এই গণতান্ত্রিক দেশে একটি জাতিকে হেনস্তা করে দেশের উন্নতি হবে না। এসআর নিয়ে তিনি অত্যন্ত সরব হন। এর পশাপাশি তিনি ওলি-আউলিয়াদের দেখানো পথে চলার উপর গুরুত্ব দিয়ে বক্তব্য রাখেন। ওলি-আউলিয়াদের সান্নিধ্যে থাকার আহ্বান জানান। এদিনের উরুস মহফিলে বরাকের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে টান্টু ভক্তরা মাইক না বাজিয়ে আসায় সবাইকে ধন্যবাদ জানান তিনি। এবং আগামীতে একইভাবে মাইক না বাজিয়ে আসার আহ্বান জানান। কাটলিছড়ার বিধায়ক সুজাম উদ্দিন লস্কর বক্তব্য রাখতে গিয়ে একইভাবে রাজ্য সরকারের মুসলিম বিদ্বেষী মনোভাবের কড়া সমালোচনা করেন। তিনি দক্ষিণ হাইলাকান্দি সহ গোটা রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে যেভাবে মুসলিমদের উচ্ছেদ করা হচ্ছে, সেনিয়ে অত্যন্ত সোচ্চার হন। এমনকী রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাকে মিঞা নিয়ে রাজনীতি না করার আহ্বান জানান। শীঘ্রই রাজ্যে উচ্ছেদ বন্ধ করতে রাজ্য সরকারের প্রতি আর্জি রাখেন তিনি।

আলগাপুরের বিধায়ক নিজাম উদ্দিন চৌধুরীও একইভাবে বক্তব্য রাখেন। এছাড়া টান্টুর পীরের কর্মময় জীবনের উল্লেখযোগ্য কেরামতি তুলে ধরে এই ওলির সান্নিধ্যে থাকতে সবাইকে আহ্বান জানিয়ে বক্তব্য রাখেন রাতাবাড়ির মওলানা আব্দুল জলিল নিজামি, মওলানা সাহিদ আহমদ, মওলানা সৈয়দ হিফজুর রহমান মিসকাত, মওলানা আলতাফ হোসেন, মওলানা মকবুল হোসেন চৌধুরী, কালাছড়ার পীর মওলানা মুসলেহ উদ্দিন, মওলানা ফয়েজ আহমদ লস্কর, মওলানা নজরুল ইসলাম, মওলানা গুলজার হোসেন, মওলানা দিদারুল ইসলাম, মওলানা সাকির আহমদ, হাফিজ জহিরুল ইসলাম প্রমুখ। এছাড়া বক্তব্য রাখেন কাটিগড়ার বিধায়ক খলিল আহমদ, রামচণ্ডী-নিমাইচান্দপুর জেলা পরিষদ সদস্য দিলোয়ার হোসেন বড়ভূইয়া, হাইলাকান্দি জেলা পরিষদ সভানেত্রীর প্রতিনিধি ফিরোজ খান চৌধুরী, জেলা পরিষদ সদস্য আফজল হোসেন প্রমুখ। সকাল আটটায় আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের পতাকা উত্তোলনের পর মোনাজাত করেন আতিকুর রহমান চৌধুরী। এরপর পবিত্র কোরান পাঠের মধ্য দিয়ে মহফিলের সূচনা হয়।

উল্লেখ্য, বৃহস্পতিবার সকাল হতেই বরাকের তিন জেলার বিভিন্ন অঞ্চল সহ বহির্বরাক থেকে কয়েক হাজার বিভিন্ন ধরনের ছোট-বড় যানবাহনের মাধ্যমে ঐতিহ্যবাহী টান্টুর পীরদ্বয়ের ইছালে সওয়াব ও উরুস মহফিলে অসংখ্য মানুষ উপস্থিত হতে দেখা যায়। বরাকের মধ্যে অন্যতম এই টান্টুর তরিকতের জলসা ও উরুস মহফিলের জন্য অধীর আগ্রহে গোটা উপত্যকার টান্টুপন্থী লোকেরা সারা বছর চেয়ে থাকেন। যা আজ জনসমুদ্রের রূপ নেয়। মাজার শরিফে জিয়ারত সহ টান্টুর বর্তমান দরবার শরিফ পরিচালক মওলানা কারি আব্দুল বাসিত চৌধুরীর সঙ্গে সাক্ষাৎ এবং জল ও তেল পড়া নিতে ভিড় ছিল লক্ষ্যণীয়। এছাড়া বিস্তীর্ণ ক্ষেতের মাঠজুড়ে ছিল ভিন্ন স্বাদের খাবারের দোকান, নানা পসরা নিয়ে ব্যবসায়ীদের বসতে দেখা যায়। বাজারে ছিলেন হাজার হাজার লোক। ছিল কয়েক হাজার ছোট-বড় যানবাহন। লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে আছরের নামাজের পর তরিকতের খতম, শিরনি বিতরণ ও আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী এই ঐতিহ্যবাহী উরুস মহফিল শান্তিপূর্ণভাবে সমাপ্ত হয়। এদিন সবশেষে উরুস ও জলসা কমিটির পক্ষ থেকে হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবক সহ মেডিক্যাল টিম, অগ্নিনির্বাপক বাহিনী, পানীয়জল বিতরণ সংস্থা সহ সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *