মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৮ জানুয়ারি : রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উৎসবের প্রাক্কালে হিন্দু সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করার লক্ষ্যকে সামনে রেখে শ্রীভূমি নগরের অরবিন্দু রায় বসতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল এক বিরাট ও তাৎপর্যপূর্ণ হিন্দু সম্মেলন। রবিবার চরবাজারস্থিত সন্ধানী সংঘ ক্লাব প্রাঙ্গনে দিনব্যাপী নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে এই উৎসবমুখর ও বৈচিত্রময় সম্মেলন সম্পন্ন হয়। সম্মেলনকে কেন্দ্র করে গোটা এলাকাজুড়ে দেখা যায় ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় আবহ। এ দিন সকাল আটটায় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রার মাধ্যমে সম্মেলনের কার্যক্রমের সূচনা হয়। ঢাক-ঢোল, ধর্মীয় পতাকা ও স্লোগানে মুখরিত হয়ে শোভাযাত্রাটি এলাকা পরিক্রমা করে। শোভাযাত্রা শেষে বিশ্বের মঙ্গল কামনায় অনুষ্ঠিত হয় মহাযজ্ঞ। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মাধ্যমে যজ্ঞ সম্পন্ন হওয়ার পর সকাল এগারোটায় প্রদীপ প্রজ্বলন, ভারতমাতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ এবং ‘বন্দেমাতরম’ সঙ্গীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে মূল অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত বিশিষ্ট অতিথিদের আয়োজক সমিতির পক্ষ থেকে উত্তরীয় ও চাদর পরিয়ে যথাযথ সম্মানে বরণ করা হয়। সমাজকর্মী তথা আয়োজক সমিতির সম্পাদক অসীম দেবের পৌরহিত্যে সম্মেলনে হিন্দুত্ব বিষয়ক বক্তব্য রাখেন বিশ্ব হিন্দু পরিষদের প্রান্ত সংগঠন মন্ত্রী দিলীপ কুমার দেব। তিনি বলেন, “হিন্দু সমাজকে প্রথমেই নিজেদের মধ্যে ভেদাভেদ, ভাষাগত ও আঞ্চলিক পার্থক্য ভুলে একসূত্রে আবদ্ধ হতে হবে। দেশের প্রাণ হলো হিন্দু ধর্ম, তাই হিন্দুরা সবাই ভাই-ভাই হিসেবে চলতে হবে।” তিনি হিন্দু সমাজকে আরও সংস্কারী ও মূল্যবোধসম্পন্ন হওয়ার আহ্বান জানান।নিজের বক্তব্যে তিনি বিশেষভাবে নারীদের ভূমিকার উপর গুরুত্ব আরোপ করে বলেন, পরিবারের মায়েদের সংস্কার ও মূল্যবোধই শিশুদের চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। তাই সমাজ সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রতিটি পরিবারের মহিলাদের আরও দায়িত্বশীল ও অগ্রণী ভূমিকা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সম্মেলনে ‘পঞ্চপরিবর্তন’ বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শ্রীভূমি জেলা কার্যবাহ মনোজ দাস। তিনি পঞ্চপরিবর্তনের পাঁচটি স্তম্ভ—স্ববোধ, সামাজিক কর্তব্য, পরিবেশ সচেতনতা, সামাজিক সমরসতা এবং পরিবার প্রবোধন—নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বিশেষ করে পরিবার প্রবোধনের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, “পরিবারের ঐক্যই সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে পারে। সমাজে ঐক্য বজায় থাকলে সেই সমাজকে কেউ অবহেলা বা আঘাত করতে পারে না।”রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ উদযাপন ও সংঘগাথা নিয়ে বক্তব্য রাখেন দক্ষিণ আসাম প্রান্তের বৌদ্ধিক প্রমুখ সুব্রত দাস। তিনি জানান, সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে নেওয়া সাতটি কর্মসূচির মধ্যে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি হলো এই হিন্দু সম্মেলন। ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়ে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের হাত ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয় এবং ২০২৫ সালে সংগঠন তার শতবর্ষ পূর্তি করেছে।সুব্রত দাস বলেন, শতবর্ষ উদযাপনের প্রথম কর্মসূচি ছিল বিজয়া সম্মেলন, পরবর্তীতে একক গৃহ সম্পর্ক অভিযান পরিচালিত হয়, যার মাধ্যমে সংঘের কর্মকর্তারা প্রতিটি ঘরে গিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করেন। এরই ফলশ্রুতিতে আজ এই বিশেষ হিন্দু সম্মেলনে মাতৃমণ্ডলীসহ বৃহত্তর হিন্দু সমাজের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “হিন্দু সমাজকে প্রথমে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ঐক্যের অভাবেই বিভেদ সৃষ্টি হয়। সংগঠিত শক্তিই একটি জাতি ও দেশের মূল চালিকাশক্তি। তিন প্রধান বক্তার বক্তব্য শেষে আয়োজক সমিতির সভাপতি রসমঞ্জ ভুইয়া উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
তিনি বলেন, এই সম্মেলন সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করার ক্ষেত্রে জেলার মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল, জেলা বিজেপির প্রাক্তন সভাপতি তথা বিশিষ্ট সমাজকর্মী সুব্রত ভট্টাচার্য, ডাঃ মানস দাস সহ বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছেন। তাঁদের সহযোগিতা ও উপস্থিতির জন্য আয়োজক সমিতির পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি। এদিনের অনুষ্ঠানে এলাকার কিশোরীদের পরিবেশনায় দেশাত্মবোধক নৃত্য দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে। সম্মেলনে অরবিন্দু রায় বসতি এলাকার বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষজনের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।সার্বিকভাবে বলা যায়, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত এই বিরাট হিন্দু সম্মেলন শুধু একটি সাংগঠনিক অনুষ্ঠানই নয়, বরং হিন্দু সমাজকে ঐক্য, সংস্কার ও দেশাত্মবোধের এক সুদৃঢ় বার্তা দিয়ে গেল যার রেশ ছড়িয়ে পড়েছে গোটা শ্রীভূমি জেলাজুড়ে।



