পাথারকান্দি মাগুরা পুঞ্জিতে ‘কালিম কাবুর রইতেদনা’ উদযাপিত

মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ১৮ জানুয়ারি : প্রকৃতির কোলে পাহাড় জঙ্গলঘেরা মাগুরা পুঞ্জিতে রবিবার যেন প্রাণ ফিরে পায় জনজাতি সমাজের চিরায়ত ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি। ঢাক-ঢোলের তালে, রঙিন পোশাকে ও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আবেশে লোয়াইরপোয়া ব্লকের খাগরাবাজার জিপির এই জনপদে উদযাপিত হল ৪৪তম জনজাতীয় সামাজিক অনুষ্ঠান কালিম কাবুর রইতেদনা। শতবর্ষী রীতিনীতির ধারাবাহিকতায় আয়োজিত এই উৎসব একদিকে যেমন অতীতের শিকড়কে স্মরণ করায়, তেমনই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য গড়ে তোলে ঐক্য, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের এক দৃঢ় ভিত্তি। পাথারকান্দি বিধাসভার লোয়াইরপোয়া ব্লকের অসম মিজোরাম ত্রিপুরা সীমান্ত ঘেষা খাগরাবাজার গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত মাগুরা পুঞ্জিতে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবের আবহে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল ৪৪তম জনজাতীয় সামাজিক অনুষ্ঠান ‘কালিম কাবুর রইতেদনা’। চরেই ইন্ডিজেনাস ফেইথ এন্ড কালচার অর্গানাইজেশনের উদ্যোগে আয়োজিত এই এক দিবসীয় ঐতিহ্যবাহী অনুষ্ঠানকে ঘিরে স্থানীয় এলাকা জুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা ও প্রাণচাঞ্চল্য পরিলক্ষিত হয়।

জনজাতি সমাজের সুপ্রাচীন ঐতিহ্য, ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক রীতিনীতিকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরার উদ্দেশ্যে প্রতিবছরের মতো এবারও এই অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। আয়োজকদের মতে, কালিম কাবুর রইতেদনা জনজাতি সমাজের একটি পরম্পরাগত ও তাৎপর্যপূর্ণ সামাজিক অনুষ্ঠান, যা সমাজপতি তথা কালিম কাবুরদের দিকনির্দেশনা অনুসরণ করে সমাজের আগামীর পথচলাকে সুসংহত করে। অনুষ্ঠানের সূচনালগ্নে জনজাতি সমাজের প্রাচীন চিরাচরিত রীতিনীতি মেনে ধর্মীয় পূজার্চ্চনা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর ভারত মাতার প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন ও প্রদীপ প্রজ্বলনের মধ্য দিয়ে দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। নির্ধারিত অনুষ্ঠানসূচি অনুযায়ী পরবর্তীতে স্থানীয় শিল্পীদের অংশগ্রহণে পরিবেশিত হয় ঐতিহ্যবাহী জনজাতীয় নৃত্য ও গীত, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে।

অনুষ্ঠান প্রসঙ্গে আয়োজক কমিটির পক্ষে চাপিয়া কালিম মানমুল মানিক চরেই বলেন, এই উৎসবের মাধ্যমে জনজাতি সমাজের নিজস্ব কৃষ্টি-সংস্কৃতি, পূজা-পদ্ধতি, খাদ্যাভ্যাস ও ঐতিহ্যবাহী বেশভূষাকে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সুদৃঢ় সামাজিক রূপরেখা গড়ে তোলাই মূল লক্ষ্য। জনজাতি সুরক্ষা মঞ্চের দক্ষিণ অসমের প্রান্ত প্রমুখ বাবুরিল চরেই, হালাম সোশিও কালচারেল অর্গানাইজেশনের স্যামুয়েল রাঙলং, ভারতীয় জনতা পার্টির শ্রীভূমি জেলা এসটি মোর্চার সহ-সভাপতি মুক্তা চরেই ও ভি মুক্তা চরেই প্রমুখ উপস্থিত থেকে এই উৎসবের গুরুত্ব ও তাৎপর্য তুলে ধরেন। বক্তারা বলেন, কালিম কাবুর রইতেদনা জনজাতি সমাজের আত্মপরিচয় ও ঐক্যের প্রতীক। এই ধরনের সামাজিক অনুষ্ঠান জনজাতিদের উত্তরণ ও সাংস্কৃতিক চেতনাকে আরও শক্তিশালী করে তোলে। পাশাপাশি নবপ্রজন্মকে নিজেদের শিকড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখতেও এই উৎসব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।এদিনের অনুষ্ঠানে স্থানীয় এলাকা ছাড়াও দুরদূরান্তের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক শতাধিক জনজাতি নারী-পুরুষ অংশগ্রহণ করেন। শিশু-কিশোরদের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানস্থল হয়ে ওঠে আরও প্রাণবন্ত। সারাদিনব্যাপী আনন্দ-উল্লাস, সাংস্কৃতিক পরিবেশনা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যের মধ্য দিয়ে রাতে অনুষ্ঠানের সফল সমাপন ঘটে। আয়োজকদের পক্ষ থেকে অনুষ্ঠানটি সুন্দর ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হওয়ায় সকল অংশগ্রহণকারী, অতিথি ও সহযোগীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করা হয়। পাশাপাশি তাঁরা উল্লেখ করেন, বর্তমান কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের বদান্যতায় এই ক্ষুদ্র জনজাতি জনগোষ্ঠী বর্তমানে সাবলীলভাবে জীবন নির্বাহ করতে পারছেন।

সরকারের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্পের ফলে জনজাতি সমাজের মধ্যে শান্তি ও সম্প্রীতির মেলবন্ধন আরও সুদৃঢ় হয়েছে। বক্তারা আরও জানান, পাথারকান্দির বিধায়ক তথা মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় পিছিয়ে পড়া জনজাতি অধ্যুষিত এলাকায় গ্রামীণ সড়কপথসহ বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে গেছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলেও আজ জনজাতি মানুষ নির্বিঘ্নে ও নিরাপদে বসবাস করতে পারছেন।সব মিলিয়ে ৪৪তম ‘কালিম কাবুর রইতেদনা’ অনুষ্ঠান জনজাতি সমাজের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক ঐক্যের এক উজ্জ্বল নিদর্শন হয়ে উঠেছে—যার মাধ্যমে অতীতের শিকড়কে আঁকড়ে ধরে ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে চলার বার্তা তুলে ধরা হয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *