ইচাবিলে হিন্দু সম্মেলনে ধর্ম ও ঐক্যের আহ্বান

মোহাম্মদ জনি, পাথারকান্দি। 
বরাক তরঙ্গ, ১১ জানুয়ারি : শাশ্বত হিন্দু চেতনা ও সংগঠিত শক্তির বার্তা রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের (আরএসএস) শতবর্ষ পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে গোটা শ্রীভূমি জেলাজুড়ে প্রতিটি গ্রাম পঞ্চায়েত স্তরে ধারাবাহিকভাবে আয়োজন করা হচ্ছে বিশাল হিন্দু সম্মেলন। এই ঐতিহাসিক ও গৌরবময় ধারাকে বজায় রেখে রবিবার ইচাবিল মণ্ডলের ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় হরিবাসর নাটমণ্ডপে আয়োজন করা হয় এক বিশাল ও বর্ণাঢ্য হিন্দু সম্মেলন।এদিন সকাল থেকেই হরিবাসর নাটমণ্ডপ ও তার আশপাশের এলাকা উৎসবমুখর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন এলাকা থেকে মাতৃমণ্ডলী সহ বৃহত্তর হিন্দু সমাজের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতিতে সম্মেলনস্থল কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে ওঠে। জাতীয় ও ধর্মীয় চেতনায় উদ্বুদ্ধ এই সম্মেলনের সূচনা হয় এক পবিত্র ও ভাবগম্ভীর পরিবেশে।অনুষ্ঠানের সূচনা লগ্নে ভারত মাতার প্রতিকৃতির সম্মুখে প্রদীপ প্রজ্বলন করেন উপস্থিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের দায়িত্বশীল কার্যকর্তারা এবং ইচাবিল গ্রাম পঞ্চায়েতের সভানেত্রী সবিতা কুর্মি। প্রদীপ প্রজ্বলনের পর বন্দেমাতরম সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্মেলনের শুভারম্ভ হয়, যা উপস্থিত সকলের মনে দেশাত্মবোধ ও গৌরবের আবহ সৃষ্টি করে।

এরপর স্থানীয় সমাজসেবী ও বিশিষ্ট ব্যক্তি রতন কুর্মির পৌরহিত্যে সম্মেলনের মূল আলোচনা পর্ব শুরু হয়। এই পর্বে হিন্দু সম্মেলনের মুখ্য উদ্দেশ্য, শাশ্বত হিন্দু ধর্মের দর্শন এবং বিশ্বের সর্ববৃহৎ অরাজনৈতিক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শতবর্ষের গৌরবময় পথচলা নিয়ে সারগর্ভ বক্তব্য রাখেন সংঘের শ্রীভূমি জেলা সম্পর্ক প্রমুখ ডঃ রজতশুভ্র পাল, কর্মকুঞ্জ বিভাগের সম্পর্ক প্রমুখ অলক পাল এবং একল অভিযানের পূর্ণকালীন কার্যকর্তা ও গুজরাটের নড়িয়াদ কেন্দ্রের প্রশিক্ষক রাধেশ্যাম পাশি।বৌদ্ধিক প্রদান করতে গিয়ে ডঃ রজতশুভ্র পাল বলেন, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষে সারা দেশে মোট সাতটি বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। তার মধ্যে তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম হল এই হিন্দু সম্মেলন।

এই সম্মেলনগুলি আয়োজনের জন্য ডিসেম্বর ও জানুয়ারি—এই দুই মাস নির্ধারিত করা হয়েছে।তিনি আরও বলেন, ১৯২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর নাগপুরে ডাঃ কেশব বলিরাম হেডগেওয়ারের হাত ধরে রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের প্রতিষ্ঠা হয়। ২০২৫ সালে সেই সংগঠন তার গৌরবময় একশ বছর পূর্ণ করেছে। শতবর্ষ উদযাপনের প্রথম কার্যক্রম হিসেবে বিজয়া সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। এরপর একক গৃহ সম্পর্ক অভিযান চালানো হয়, যার মাধ্যমে শ্রীভূমি জেলার প্রতিটি হিন্দু ঘরে ঘরে সংঘের কার্যকর্তারা পৌঁছে গিয়ে সম্পর্ক স্থাপন করেন। তারই ফলশ্রুতিতে আজ এই হিন্দু সম্মেলনে বিপুল সংখ্যক মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপস্থিত হয়েছেন।তিনি তাঁর বক্তব্যে বিশেষভাবে জোর দিয়ে বলেন, হিন্দু সমাজকে সর্বপ্রথম ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। একটি পরিবারে যদি ঐক্য না থাকে, তাহলে সেখানে বিভেদ দেখা দেয়। সমাজ ও জাতির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই ঐক্যবোধকে সামনে রেখেই সংঘের মূল লক্ষ্য হল সমাজ ও জাতিকে এক সুতোয় গেঁথে শক্তিশালী করে তোলা।এরপর অলক পাল তাঁর বৌদ্ধিক বক্তব্যের শুরুতেই বিশ্বের সর্ববৃহৎ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের পক্ষ থেকে উপস্থিত সকলকে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও স্বাগত জানান। তিনি বটবৃক্ষের ন্যায় বিস্তৃত এই সংগঠনের সারসংক্ষেপ প্রেক্ষাপট ও সংঘরেখা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোকপাত করেন। সংঘের প্রতিষ্ঠাতা ডাঃ হেডগেওয়ারের বাল্যকালীন জীবন, তাঁর দেশপ্রেম, আত্মত্যাগ এবং হিন্দু সমাজের ঐক্যের জন্য আজীবন কাজ করার দৃঢ় সংকল্পের কথা তিনি আবেগঘন ভাষায় তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে—সংগঠিত শক্তিই একটি জাতি ও দেশের মূল চালিকাশক্তি, আর সেই দর্শন থেকেই রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের জন্ম।এরপর রাধেশ্যাম পাশি তাঁর বক্তব্যে বলেন, প্রান্ত, মত, ভেষ, ভাষার পার্থক্য ভুলে আমাদের সবাইকে আগে হিন্দু পরিচয়ে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

তিনি বলেন, ভারত রাষ্ট্রের প্রাণ হল ধর্ম, আর সেই ধর্মকে ধারণ করেই হিন্দু সমাজকে এগিয়ে যেতে হবে। তিনি হিন্দু সমাজকে সংস্কারী ও সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান এবং বিশেষভাবে পরিবারের মহিলাদের এগিয়ে আসার কথা বলেন। তাঁর কথায়, মায়ের সংস্কার সন্তানের চরিত্র গঠনে সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে, তাই মায়েদের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করার আহ্বান জানান তিনি।সম্মেলনের শেষ পর্বে ইচাবিল হিন্দু জাগরণ কমিটির সভাপতি রতনলাল কানু উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন। তিনি জানান, এই অনুষ্ঠানের সফল আয়োজনে কেন্দ্রের বিধায়ক তথা মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের সক্রিয় সহযোগিতা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি প্রতিদিন রতন কুর্মির মাধ্যমে অনুষ্ঠানের খোঁজখবর নেওয়ার পাশাপাশি আর্থিক অনুদান প্রদান করেন, যার ফলে এই অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। আয়োজক কমিটির পক্ষ থেকে বিধায়ককে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানানো হয়। তাঁরা আরও বলেন, মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল স্থানীয় এলাকার বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সবসময় সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন।এদিনের অনুষ্ঠানে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে স্থানীয় কিশোরীদের সমবেত পরিবেশনায় ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর নৃত্য ও ধামাইল নৃত্য উপস্থিত দর্শকদের মুগ্ধ করে।

এই হিন্দু সম্মেলনে অন্যান্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সংঘের কার্যকর্তা ঘনশ্যাম কৈরি, অজিত ঘোষ, দেবজ্যোতি দাস। আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির শ্রীভূমি জেলা সহ-সভাপতি হৃষিকেশ নন্দী, লোয়াইরপোওয়া জেলা পরিষদ সদস্য স্বপন দাস, ইচাবিল জিপির প্রাক্তন সভাপতি রামেশ্বর ছেত্রী, লোয়াইরপোওয়া ব্লক মণ্ডল বিজেপির সভানেত্রী সম্পা রানি চৌধুরী, ইচাবিল বাগান পঞ্চায়েত সভাপতি রাজু কুর্মি, স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তি শেখর ভট্টাচার্য সহ আরও অনেক গণ্যমান্য ব্যক্তি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *