বরাক তরঙ্গ, ১০ জুলাই : অসম বিধানসভার ষোড়শ অধিবেশনে শুক্রবার ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করা হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথমবারের মতো বিধানসভায় রাজ্য বাজেট উপস্থাপন করেন জয়ন্ত মল্ল বরুয়া। এটি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বাধীন সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম পূর্ণাঙ্গ বাজেট।
সাধারণত এপ্রিল মাসে বাজেট পেশ করা হলেও, এবারের বিধানসভা নির্বাচন ও নতুন সরকার গঠনের কারণে জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ বাজেট উপস্থাপন করা হয়। সকাল ১১টা ১০ মিনিটে বাজেট পেশ করেন অর্থমন্ত্রী। জনকল্যাণমূলক প্রকল্প, অবকাঠামো উন্নয়ন, শিল্প, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে এই বাজেটে।
বাজেটের আর্থিক চিত্র
রাজস্ব খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১,২৬,৩৬৯.৫৭ কোটি টাকা।
বিশেষ মূলধনী ব্যয় ২,০০০ কোটি টাকা।
মোট প্রাক্কলিত ব্যয় ২,৮৫,০৮৪.৪৫ কোটি টাকা।
চলতি বছরে আনুমানিক ৩,২২৫ কোটি টাকা উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা।
বছরের শুরুতে ৩,৬৪৪.২৬ কোটি টাকা ঘাটতি থাকায় অর্থবর্ষ শেষে ঘাটতি দাঁড়াবে ৪১৯.২৬ কোটি টাকা।
রাজ্যের মোট অভ্যন্তরীণ উৎপাদনের (GSDP) ৩ শতাংশ আর্থিক ঘাটতি লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গুয়াহাটিতে মেট্রো রেল
গুয়াহাটিতে রিং রোডের পাশ দিয়ে মেট্রো রেললাইন নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। উপগ্রহ শহরগুলিকে যুক্ত করে যানজট কমানো এবং নগর উন্নয়ন ত্বরান্বিত করাই এই প্রকল্পের মূল লক্ষ্য।
গুয়াহাটিতে ২,৫০০ কোটি টাকার ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ প্রকল্প
গুয়াহাটিতে ২,৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে ভূগর্ভস্থ বিদ্যুৎ নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা হবে। প্রথম পর্যায়ে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাজ শুরু হবে।
‘মিশন সেনেহজরি’
অসমের বিখ্যাত মুগা রেশমকে আন্তর্জাতিক বাজারে তুলে ধরতে ৪০০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন বছরের ‘মিশন সেনেহজরি’ শুরু হবে। ঢকুয়াখনায় মুগা সিল্ক পর্যটন উদ্যান এবং ধেমাজিতে মুগা স্পিনিং মিল স্থাপন করা হবে।
কৃষি, মৎস্য ও পশুপালন
২০৩০-৩১ সালের মধ্যে মাছ উৎপাদন ১০ লক্ষ মেট্রিক টনে উন্নীত করার লক্ষ্য।
ডিম উৎপাদন ৬০ লক্ষে উন্নীত করার পরিকল্পনা।
৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে দুগ্ধ উন্নয়ন অভিযান।
হাঁস-মুরগি ও শূকর পালনকে আধুনিক করে মাংস উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ
‘হর ঘর জল’
আগামী পাঁচ বছরে পানীয় জলের অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যাংকের সহায়তায় বৃহৎ প্রকল্প গ্রহণ করবে সরকার।
বিধায়কদের উন্নয়ন তহবিল বৃদ্ধি
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষে প্রতিটি বিধায়কের উন্নয়ন তহবিল ১.৫ কোটি টাকা করা হয়েছে। ২০২৭-২৮ থেকে তা ২ কোটি টাকা হবে। এর ১০ শতাংশ জনকল্যাণমূলক জরুরি কাজে সংরক্ষিত থাকবে।
ডিব্রুগড়ের জন্য ৫০০ কোটি টাকা
ডিব্রুগড় রাজধানী অঞ্চলের অতিরিক্ত উন্নয়নের জন্য আগামী পাঁচ বছরে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে।
সরকারি কর্মীদের জন্য বড় ঘোষণা
সরকারি কর্মীরা দুই সপ্তাহের পিতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন।
১ এপ্রিল ২০১৭-এর পরে চাকরিতে যোগ দিয়ে এক বছরের মধ্যে কর্মরত অবস্থায় মৃত্যুবরণকারী কর্মীর পরিবারকে ৫০ শতাংশ পেনশন দেওয়ার প্রস্তাব।
‘আপন ঘর’ ও ‘আপন বাহন’ প্রকল্প
সরকারি কর্মীদের জন্য ‘আপন ঘৰ’ ও ‘আপন বাহন’ প্রকল্পের মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানো হয়েছে। বৈদ্যুতিক গাড়ির ক্ষেত্রে সুদের ভর্তুকি ৪ শতাংশ করা হয়েছে।
আত্মনির্ভর অসম অভিযানে ৫০০ কোটি টাকা
মুখ্যমন্ত্রীর আত্মনির্ভর অসম অভিযানের জন্য ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। অবশিষ্ট যোগ্য আবেদনকারীদের চলতি বছরই সুদমুক্ত ঋণ দেওয়া হবে।
‘মিশন বসুন্ধরা ৪.০’
নতুন পর্যায়ে বরাক উপত্যকা, মোরান, মোটক, আহোম, চুতিয়া, কোচ রাজবংশীসহ অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ভূমির অধিকার নিশ্চিত করা হবে। অন্তত তিন প্রজন্ম ধরে অসমে বসবাসকারী পরিবারগুলিকে জমি বরাদ্দের সুযোগ দেওয়া হবে।
উচ্চশিক্ষায় বড় পরিকল্পনা
আগামী পাঁচ বছরে প্রতিটি জেলায় একটি করে বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল কলেজ ও ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে নজিরবিহীন উদ্যোগ
প্রতিটি উপ-স্বাস্থ্য কেন্দ্রে একজন করে এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগ করা হবে। তাঁদের সহায়তা করবেন ANM ও GNM কর্মীরা। এছাড়া বর্তমানে থাকা ১৪টি মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে আরও ১৪টি যুক্ত হয়ে মোট সংখ্যা ২৮-এ পৌঁছাবে।
চা শিল্পে বিশেষ প্রণোদনা
চা শিল্পের উন্নয়নে বিশেষ প্রণোদনা প্রকল্প চালু হবে। অসমের অর্থডক্স ও বিশেষ শ্রেণির চায়ের সঙ্গে ম্যাচা চা-কেও রপ্তানির আওতায় আনা হবে।
সেচ ব্যবস্থায় ৩,০০০–৪,০০০ কোটি টাকার প্রকল্প
বরাক, সুবনশিরি, মানাহ, কপিলীসহ একাধিক নদী থেকে খরার সময় সেচের জন্য উচ্চচাপ পাইপলাইনভিত্তিক আধুনিক সেচব্যবস্থা গড়ে তোলা হবে।
বড় অবকাঠামো প্রকল্প
গুয়াহাটি বিমানবন্দর থেকে জলুকবাড়ি পর্যন্ত এলিভেটেড করিডর।
মরিগাঁও ও দরংকে সংযুক্ত করে ব্রহ্মপুত্রের ওপর নতুন সেতু। প্রকল্প ব্যয় ৩,৪২৩ কোটি টাকা।
যোরহাট-মাজুলি সেতু
২০২৭ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে যোরহাট-মাজুলি সেতুর নির্মাণকাজ সম্পূর্ণ করার ঘোষণা।
অসমমালা প্রকল্প
কাজিরাঙা এলিভেটেড করিডর, গুয়াহাটি রিং রোড, বাইহাটা-তেজপুর চার লেন সড়কসহ একাধিক সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে।
এইচআইভি আক্রান্ত পরিবারকে সহায়তা
এইচআইভি আক্রান্ত পরিবারের শিশু ও মহিলাদের এক লক্ষ টাকা আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
স্কুটি বিতরণ বন্ধ
চলতি বছরে প্রায় ১৮ হাজার শিক্ষার্থী স্কুটি পেলেও আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই প্রকল্প বন্ধ করা হবে। পরিবর্তে ‘নিযুত মইনা’ ও ‘নিযুত বাবু’ প্রকল্পকে আরও শক্তিশালী করা হবে।
অরুণোদয় প্রকল্প পুনরায় চালু
আগস্ট মাস থেকে আবার অরুণোদয় প্রকল্পের মাসিক আর্থিক সহায়তা শুরু হবে। রেশন কার্ডধারীরা মসুর ডাল ও চিনি পাবেন। ভোজ্যতেল নিয়েও সরকার ইতিবাচক সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত দিয়েছে।
দুই লক্ষ চাকরির লক্ষ্য
আগের মেয়াদে ১.৫৪ লক্ষ সরকারি চাকরি দেওয়ার পর এবার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ২ লক্ষ নিয়োগের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। এ জন্য মুখ্য সচিবের নেতৃত্বে একটি টাস্ক ফোর্সও গঠন করা হয়েছে।
নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব
রাজ্যে আরও ৪টি নতুন মেডিকেল কলেজ স্থাপনের প্রস্তাব ঘোষণা করা হয়েছে। প্রস্তাবিত তালিকায় রয়েছে গোয়ালপাড়া, হাইলাকান্দি, হোজাই এবং বজালি জেলা। এই চার জেলায় নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।


