অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে কড়া বার্তা, পাথারকান্দিতে অমিত শাহের গর্জন

Spread the news

মোহাম্মদ জনি, শ্রীভূমি।
বরাক তরঙ্গ, ৭ এপ্রিল : নির্বাচনী প্রচারের শেষ লগ্নে শ্রীভূমি জেলার পাথারকান্দি বিধানসভা কেন্দ্র রীতিমতো উত্তাল হয়ে উঠল কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের গর্জনে। মঙ্গলবার বাজারিছড়া জিপির কালাছড়া লালমাটি মাঠে আয়োজিত ‘বিজয় সংকল্প’ সমাবেশে সকাল প্রায় ১১টায় উপস্থিত হয়ে তিনি সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন অনুপ্রবেশকারীদের খুঁজে খুঁজে বের করতে হবে, আর রাজ্যে বিজেপি সরকার গঠন করতেই হবে। সভামঞ্চে উঠেই ভারত মাতা কি জয় ও “জয় শ্রীরাম” ধ্বনিতে মুখরিত করে তোলেন গোটা প্রান্তর। মুহূর্তের মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে জনসভা রূপ নেয় আবেগ, উন্মাদনা ও রাজনৈতিক বার্তার এক বিশাল মঞ্চে।
নিজের ভাষণের সূচনাতেই শ্রীভূমির এই পুণ্যভূমি থেকে মা কামাখ্যা দেবীর প্রতি প্রণাম জানান অমিত শাহ। পাশাপাশি গৌরাঙ্গ মহাপ্রভু মন্দির ও ইচাবিল শিব মন্দিরের প্রতিও শ্রদ্ধা নিবেদন করে তিনি বক্তব্য শুরু করেন। তিনি বলেন, এই ভূমি শুধু ধর্মীয় ঐতিহ্যের নয়, এটি আত্মত্যাগ, সংস্কৃতি ও জাতীয় চেতনার প্রতীক।

এরপর একের পর এক তোপ দাগতে থাকেন বিরোধী কংগ্রেসের বিরুদ্ধে। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেস বরাবরই অসম ও বরাক উপত্যকার স্বার্থের বিরুদ্ধে কাজ করেছে। করিমগঞ্জের নাম পরিবর্তন করে ‘শ্রীভূমি’ করার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিজেপি এই ভূমির গৌরব ফিরিয়ে দিয়েছে, কিন্তু কংগ্রেস শুধু রাজনীতি করেছে।

অনুপ্রবেশ ইস্যুতে কড়া অবস্থান নিয়ে অমিত শাহ বলেন, বরাক উপত্যকাকে অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে মুক্ত করতে হলে বিজেপিকেই ক্ষমতায় আনতে হবে।” এই প্রসঙ্গে কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকেও নিশানা করে তিনি কটাক্ষ ছুড়ে দেন। তাঁর বক্তব্য, “যাদের শিকড় ইতালির সঙ্গে জড়িত, তারা শ্রীভূমির মাটি ও মানুষের আবেগ কখনও বুঝবে না।তিনি আরও বলেন, “কংগ্রেস সিএএ চায় না, কারণ তারা জানে সিএএ কার্যকর হলে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। একইসঙ্গে তিনি স্পষ্ট বার্তা দেন অনেক হয়েছে, এবার পরিবর্তনের সময়। নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে অসমে উন্নয়ন ও নিরাপত্তা দুটোই নিশ্চিত।

পাথারকান্দির নামের ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন পাথার মানে অটুট ইচ্ছাশক্তি, আর কান্দি মানে পাহাড়সম ভরসা এই শক্তিকে কেউ হারাতে পারবে না। তাঁর এই বক্তব্যে উপস্থিত জনতার মধ্যে নতুন উদ্দীপনা লক্ষ্য করা যায়।ভাষণের একাংশে বরাক উপত্যকার বীরাঙ্গনা কমলা ভট্টাচার্যসহ সুপুত্র দ্বারিকা প্রসাদ তেওয়ারি, অরুণ কুমার চন্দ ও ইন্দুপ্রভা দেবীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন তিনি।

উন্নয়ন প্রসঙ্গে অমিত শাহ বলেন, “নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে অসমে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, বিনিয়োগ এসেছে, উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলেছে। তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, আগামী পাঁচ বছরে চা শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকায় উন্নীত করা হবে। পাশাপাশি চা বাগানে ‘একটি কলি দুটি পাতা’ প্রকল্প, আধুনিক বিদ্যালয় স্থাপন এবং শ্রমিকদের ভূমি পাট্টা দেওয়ার বিষয়ও উল্লেখ করেন।
এছাড়াও খাসপুরের ঐতিহ্য সংরক্ষণে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা, শনবিলের উন্নয়ন, শ্রীভূমিতে মেডিকেল কলেজ স্থাপন, সিভিল হাসপাতালে চাইল্ড কেয়ার ইউনিট এবং বরাকে এইমসের নতুন কেন্দ্র গঠনের কথাও ঘোষণা করেন তিনি।কংগ্রেসকে আক্রমণ করে তিনি বলেন ৬২ সালের যুদ্ধে চীন এগিয়ে এলে কংগ্রেস সরকার পিছিয়ে যায়। কিন্তু আজ মোদির নেতৃত্বে ভারতের এক ইঞ্চি জমিও কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না।

সমাবেশে উপস্থিত জনতাকে উদ্দেশ্য করে তিনি আহ্বান জানান ৯ এপ্রিলের নির্বাচনে এমন ভোট দিন, যাতে দূরবীন দিয়েও কংগ্রেসকে খুঁজে পাওয়া না যায়।চৈত্রের তীব্র দাবদাহ উপেক্ষা করে প্রায় ৪০-৫০ হাজার মানুষের উপস্থিতি এদিনের সভাকে এক ঐতিহাসিক রূপ দেয়। কয়েকদিনের প্রতিকূল আবহাওয়ার পরও এত বিপুল জনসমাগম বিজেপি শিবিরে নতুন আত্মবিশ্বাস জোগায়।

সভা শেষে বিজেপি প্রার্থী তথা মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, এই জনসমাগমই প্রমাণ করে মানুষ উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার পক্ষে। অমিত শাহজির এই সফর আমাদের লড়াইকে আরও শক্তিশালী করেছে।উল্লেখ্য, এদিনের সভায় উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অজয় তামতা, জেলা বিজেপির সভাপতি সঞ্জীব বণিক, সুনীল শর্মা, লঙ্কন সিং রানা, হৈমন্তী ভাঁসফর, শান্তিলাল সিনহা, জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অনিল কুমার ত্রিপাঠি, উপ-সভাপতি হৃষিকেশ নন্দীসহ একাধিক নেতৃত্ব। সভা শেষে অমিত শাহ হেলিকপ্টারযোগে হাইলাকান্দির উদ্দেশ্যে রওনা দেন, যেখানে তাঁর আরেকটি নির্বাচনী সভা নির্ধারিত ছিল। সব মিলিয়ে, পাথারকান্দির এই ‘বিজয় সংকল্প’ সমাবেশ শুধু একটি নির্বাচনী প্রচারসভা নয়, বরং আসন্ন ভোটযুদ্ধের আগে বিজেপির শক্তি, কৌশল ও রাজনৈতিক বার্তার এক সুস্পষ্ট প্রদর্শনী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে রইল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *