রাত পোহালেই শুরু হবে উচ্ছেদ, আতঙ্ককে দামছড়ার ৫২২টি পরিবার

এবি লস্কর, কাটলিছড়া।
বরাক তরঙ্গ, ১ ফেব্রুয়ারি : রাত পোহালেই শুরু হবে উচ্ছেদ। আতংকময় পরিবেশ দক্ষিণ হাইলাকান্দির বনাঞ্চলে।
দক্ষিণ হাইলাকান্দির সংরক্ষিত বনাঞ্চলের মণিপুরিসিট, কুকিনালা, কুকিটিলা, দামছড়ামুখ,পূর্ব দামছড়া,মধ্য দামছড়া  এলাকার ৫২২টি পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিশ দেওয়ার পর আগামীকাল থেকে শুরু হবে উচ্ছেদ। আগামীকাল থেকে শুরু করে ৪৮ ঘন্টা ধরে চলবে ধ্বংসলীলা। জামিরা জিপির মানচিত্র থেকে মুছে যাবে “দামছড়া” গ্রাম।  বন বিভাগের অবৈধভূমি দখলমুক্ত করতে রণসাজে প্রস্তুত জেলা প্রশাসন সহ রাজ্য সরকারের বুলডোজার। হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনের তরফে অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে মোতায়েন করা হয়েছে বিশাল পুলিশ ও সিআরপিএফ বাহিনী। জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের তরফে ইতিমধ্যে উচ্ছেদস্থলে পৌছে গেছেন বিশাল মেডিকেল টিম সহ জরুরীকালীন এম্বুলেন্স পরিষেবা। পৌছেগেছে অগ্নিনির্বাপক বাহীনি। উচ্ছেদিত এলাকায় সহজে পৌছতে জেসিবি দিয়ে টিলা কেটে রাস্তা নির্মাণ করা হয়েছে। ছয় দশকের বেশি সময় থেকে দক্ষিণ হাইলাকান্দির সংরক্ষিত বনাঞ্চলে বসবাস করা ৫২২টি পরিবারের উপর নেমে এসেছে এক বিশাল যুদ্ধদেংহী পরিবেশ। রবিবার পুরোদিন শেষ বারের মতো জেলা প্রশাসনের তরফে মাইকিং করে জানানো হয়েছে বন বিভাগের জায়গা খালি করে দিতে। অন্যথায় আগামী দুইদিনের উচ্ছেদে কোন পরিবারের কোন ধরণের ক্ষতির সম্মূখীন হলে ক্ষয়ক্ষতির কোন  দায়ভার জেলা প্রশাসন বা বন বিভাগ নিতে পারবে না।  এক আতঙ্কময় পরিবেশের মধ্যে ক্ষোভের আগুন ধূমায়িত হচ্ছে উচ্ছেদের সম্মূখীন হওয়া জনতার মধ্যে। তাদের ক্ষোভ কাটলিছড়ার বিধায়ক সুজাম উদ্দিন লস্করের উপর। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সহ এলাকাবাসীর অভিযোগ কাটলিছড়ার বিধায়ক সুজাম উদ্দিন লস্কর এক জনসভায়  রাতাবাড়ির বিধায়ক বিজয় মালাকারকে  চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, দক্ষিণ হাইলাকান্দির বনাঞ্চলে উচ্ছেদ করতে হলে প্রথমে বিধায়ক সুজাম উদ্দিন লস্করের লাশের উপর দিয়ে বুলডজার নিয়ে যেতে হবে এবং পরে উচ্ছেদ করতে হবে । বিধায়কের এমন মন্তব্যের জন্য আজ আক্রোশমূলক উচ্ছেদ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। শিশু কিশোর নিয়ে পুরুষ মহিলারা এক অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মূখীন হয়েছেন ৫২২টি পরিবারের লোকেরা।

প্রায় ৬৫ বছর ধরে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা একটি জনবসতি মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মানচিত্র ও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যাওয়ার মুখে। এই জনপদকে টিকিয়ে রাখতে এলাকার বাসিন্দারা আইনি লড়াই চালিয়েছিলেন। পেশ করা হয়েছিল বিভিন্ন নথি, দ্বারস্থ হয়েছিলেন প্রশাসনের, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই লড়াই উচ্ছেদ ঠেকাতে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, এই পরিবারগুলো কোনো সাম্প্রতিক বা গোপন দখলদার নয়। ১৯৬৫ সাল থেকে দরিদ্র, ভূমিহীন কৃষক পরিবারগুলো হাইলাকান্দি জেলার দামছড়া এলাকায় বসবাস করে আসছেন। তারা যে জমিতে বসতি গড়েছেন তা ছিল অনাবাদী ও পতিত প্রকৃতির বনজ গাছপালা শূন্য বন সংরক্ষণের উপযোগী নয় কৃষিকাজের উপযোগী অঞ্চল। তাদের জীবিকার একমাত্র উপায় ছিল কৃষিকাজ। বিকল্প জমি, চাকরি বা আয়ের অন্য কোনো উৎস তাদের ছিল না। চরম দারিদ্র্য ও অনাহার থেকে বাঁচতেই তারা সেখানে আশ্রয় নিয়েছিলেন। দামছড়া হঠাৎ করে গড়ে উঠা কোনো অস্থায়ী ঝুপড়িবসতি নয়। সময়ের সাথে এটি একটি সুসংগঠিত গ্রামে পরিণত হয়েছিল। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে প্রকাশ্য ও শান্তিপূর্ণ বসবাস সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দশকের পর দশক বন বিভাগ, জেলা প্রশাসন কিংবা পুলিশ কেউ তাদের উচ্ছেদ করেনি। এই দীর্ঘ প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা ও নীরব সম্মতি কার্যত বসতিটির অস্তিত্বকে পরোক্ষ স্বীকৃতি দিয়ছিল। তাছাড়া সরকারি উন্নয়ন ও প্রমাণ করছে দামছড়া একটি জনবসতি পূর্ণ  গ্রাম। যদি এলাকাটি কঠোরভাবে সংরক্ষিত বনভূমি হতো, তবে রাস্তা নির্মাণ, বিদ্যুৎ সংযোগ,

অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র, পানীয়জলের প্রকল্প, ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়, ২টি ভোট গ্রহণ কেন্দ্র, স্বাস্থ্য উপকেন্দ্র, এমজিএনরেগা কাজ, ঘরে ঘরে সোলার বিদ্যুৎ সংযোগ কখনওই সরকারি ভাবে সম্পন্ন হতো না। জামিরা গ্রাম পঞ্চায়েতের ২ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত দামছড়া গ্রাম, অর্থাৎ প্রশাসনিকভাবে স্বীকৃত গ্রামীণ ইউনিটের অংশ হিসেবেই উন্নয়ন হয়েছে।

জানা গেছে, দামছড়ার বাসিন্দারা নিজেরাই বন গ্রাম হিসেবে স্বীকৃতি চেয়ে আবেদন করেছিলেন। ১৯৯৪ সালের ২৩ জুন   PCCF আসাম DFO-কে বনগ্রাম সেটেলমেন্টের নির্দেশ দেন। ১৯৯৪ সালের ৪ জুলাই Southern Assam Circle থেকেও একই নির্দেশ মাঠপর্যায়ের তদন্তে নিশ্চিত হয়।   ২০০২ সালে প্রদান করা  উচ্ছেদ নোটিশের বিরুদ্ধে WP(C) 5605/2002 মামলা দায়ের হয়। ২০০৭ সালের ১২ জুন  হাইকোর্ট স্পষ্ট নির্দেশ দেয় আইনসম্মত প্রক্রিয়া ছাড়া উচ্ছেদ  হবে না। পরবর্তীতে তদানীন্তন বনমন্ত্রীর নির্দেশে ডিএফও-র পুনর্বিবেচনায় ৬০ পরিবারকে ৯০০ বিঘা এলাকা সহ “Damcherra Punji Forest Village” হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।অর্থাৎ সরকারি নথিতে দামছড়া বন গ্রাম হিসেবে প্রক্রিয়াধীন/স্বীকৃত ছিল। ২০২৫ সালের ১৭ ডিসেম্বর  ফের নতুন উচ্ছেদ নোটিশ প্রদান করা হয়। ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর বাসিন্দাদের নথিপত্র যাচাই এবং  আপত্তি একই দিনে যাচাই ছাড়া আবেদন খারিজ ও পুলিশি উচ্ছেদের হুমকি প্রদান করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে।

বিভিন্ন মহলের দাবি, দামছড়ার জনগণ অবৈধ দখলকারী ছিলেন না। তারা বন বিভাগের নথি, তদন্ত, নির্দেশ, স্বীকৃতি প্রক্রিয়া—সব কিছুর অংশ ছিলেন। তবুও আজ তাদের নথি উপেক্ষা করে “encroacher” তকমা দিয়ে উচ্ছেদ—এটি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং রাষ্ট্রের নিজস্ব ইতিহাস অস্বীকার করার অভিযোগ উঠছে। সর্বোপরি দামছড়া কোনো রাতারাতি দখলকৃত এলাকা নয়।  ৬৫ বছরে তিলে তিলে  একটি বসতি গড়ে উঠেছিল এবং যা ছিল  প্রশাসনিকভাবে পরিচিত একটি গ্রাম। আগামী ৪৮ ঘন্টায় হাইলাকান্দি জেলার মানচিত্র থেকে মুছে দেওয়া হবে দামছড়া গ্রাম।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *